সরকারি জরুরি ফোনকেও ‘স্প্যাম’ বলছে ট্রুকলার! কেন্দ্র ও ট্রাইয়ের কড়া পদক্ষেপে মাথায় হাত অ্যাপ কর্তৃপক্ষের

টেলিকম রেগুলেটরি অথরিটি অফ ইন্ডিয়া বা ট্রাইয়ের (TRAI) সঙ্গে জনপ্রিয় কলার আইডি প্ল্যাটফর্ম ট্রুকলারের (Truecaller) বিরোধ বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। মূলত ট্রুকলারের ইনকামিং কল ট্যাগিং পদ্ধতি, বিশেষ করে ১৪০ এবং ১৬০০ সিরিজের বাণিজ্যিক ও সরকারি নম্বরগুলির ওপর ‘ফ্রিকোয়েন্টলি ব্লকড’ (Frequently Blocked) বা স্প্যাম ট্যাগ বসানো নিয়ে নিয়ামক সংস্থার তরফ থেকে অত্যন্ত জোরালো আপত্তি জানানো হয়েছে। বর্তমান সময়ে যখন আমাদের মোবাইল ফোনে কোনো অপরিচিত বা কন্টাক্ট লিস্টে সেভ না থাকা নম্বর থেকে কল আসে, তখন ট্রুকলার স্ক্রিনে একটি বিশেষ উইন্ডো বা ট্যাগ প্রদর্শন করে। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট নম্বরটি স্প্যাম, ফ্রড বা একাধিক ব্যবহারকারীর দ্বারা অবরুদ্ধ কি না, সেই সমস্ত তথ্য তৎক্ষণাৎ স্ক্রিনে ফুটে ওঠে। এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাই এখন সরকারি কাজে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ১৬০০ সিরিজের বিশেষ এই নম্বরগুলো মূলত দেশের কেন্দ্রীয় সরকার, বিভিন্ন রাজ্য সরকার এবং সরকারি নিয়ন্ত্রাধীন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে থাকে। জনসাধারণের স্বার্থে সরকারের বিভিন্ন জরুরি নীতি, জনকল্যাণমূলক তথ্য এবং আপডেট নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই মূলত এই সিরিজের নম্বরগুলি বরাদ্দ করা হয়েছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, সাধারণ বহু ব্যবহারকারী এই ধরনের প্রমোশনাল বা কমার্সিয়াল কল নম্বর আগে থেকেই ব্লক করে রাখেন। এর ফলে যখনই ১৬০০ সিরিজের কোনো সরকারি নম্বর থেকে কোনো সাধারণ নাগরিকের নম্বরে কল আসে, তখনই ট্রুকলারের অ্যালগরিদম স্ক্রিনে একটি সতর্কবার্তামূলক ট্যাগ ফুটিয়ে তোলে যেখানে লেখা থাকে ‘frequently blocked’। অর্থাৎ, ব্যবহারকারীদের খুব স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয় যে, এই নির্দিষ্ট নম্বরটি ইতিপূর্বে বহু মানুষ ব্লক করেছেন।
এর ফলে সাধারণ মানুষের মনে একপ্রকার মানসিক ভীতি ও অনীহা তৈরি হচ্ছে। সাধারণ ব্যবহারকারীরা যখন স্ক্রিনে দেখতে পান যে সংশ্লিষ্ট নম্বরটি অন্য বহু মানুষের দ্বারা বারবার ব্লক করা হয়েছে, তখন তাঁরা সেই ফোন রিসিভ তো দূরঅস্ত, উল্টে রিং বাজতেই ফোন কেটে বা ডিসকানেক্ট করে দিচ্ছেন। এর প্রত্যক্ষ পরিণতি হিসেবে সরকার এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ জরুরি ফোনকলগুলি শেষপর্যন্ত সাধারণ নাগরিকদের কাছে আর পৌঁছতেই পারছে না। দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদসংস্থা আইএএনএস (IANS)-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ট্রাইয়ের এক শীর্ষ আধিকারিক অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়েছেন যে, ১৬০০ সিরিজের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল সরকারি নম্বরে এ ধরনের ‘ব্লক ট্যাগ’ বা স্প্যাম লেবেল যোগ করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কারণ এই নির্দিষ্ট সিরিজের নম্বরগুলোর মাধ্যমেই মূলত অত্যন্ত জটিল ফ্রড অ্যালার্ট, জরুরি আর্থিক লেনদেন যাচাইকরণ, ব্যাঙ্কিং নোটিফিকেশন এবং সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের অতি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ রক্ষা করা হয়।
ট্রাইয়ের সাফ কথা, এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ এবং সরকারি পরিষেবা প্রদানকারী নম্বরে ‘frequently blocked’ ট্যাগ ঝুলিয়ে দেওয়ার ফলে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে এই কলগুলো এড়িয়ে চলবেন, যা দেশের সামগ্রিক জনস্বার্থ ব্যবস্থার পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক। ঠিক একই যুক্তি ১৪০ সিরিজের বাণিজ্যিক ও অফিশিয়াল নম্বরগুলোর ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য বলে জানিয়েছে রেগুলেটরি অথরিটি। ট্রাইয়ের স্পষ্ট মতামত হলো, কোনো নম্বর স্প্যাম কি না তা কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ না করে পুরো বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। যদি কোনো নির্দিষ্ট ব্যবহারকারীর মনে হয় যে তিনি এ ধরনের কমার্সিয়াল কল বা বার্তা গ্রহণ করতে চান না, তবে তিনি নিজেই নিজের ফোনটি ডিএনডি (DND) বা ডু নট ডিস্টার্ব ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় নথিভুক্ত করতে পারেন। অন্যদিকে, ট্রুকলারের পক্ষ থেকে সাফাই দিয়ে জানানো হয়েছে যে, এই ধরনের ট্যাগিং তুলে নেওয়া হলে স্প্যাম কলের পরিমাণ একলাফে বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে এবং এই নিয়ন্ত্রণ বন্ধ হলে সাধারণ ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা ও সুরক্ষা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।