‘সবকিছু শেষ করে দিলাম!’ স্ত্রীকে খুন করে হোয়াটসঅ্যাপে হাড়হিম করা স্ট্যাটাস দিয়ে আত্মঘাতী স্টেট ব্যাঙ্ক অফিসার

স্বামী-স্ত্রী দুজনেই সফল ব্যাঙ্কের কর্মী। কিন্তু তুষের আগুন দানা বাঁধছিল দীর্ঘ দিন ধরেই। স্ত্রীর ডিভোর্স অর্ডার হাতে পাওয়ার মাত্র একদিন আগেই নেমে এল এক ভয়ংকর ও নৃশংস অন্ধকার। উত্তরপ্রদেশের লখনউ শহরে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে একটার পর একটা চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসছে, যা শুনে শিউরে উঠছেন সাধারণ মানুষ। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার (SBI) এক ফিল্ড অফিসার মানস বাজপেয়ী তাঁর স্ত্রী তথা আইসিআইসিআই (ICICI) ব্যাঙ্কের রিলেশনশিপ ম্যানেজার দিব্যা মিশ্র এবং মানসিকভাবে অসুস্থ বোনকে একে একে গুলি করে হত্যা করার পর নিজে আত্মঘাতী হয়েছেন। পুরো রোমহর্ষক ঘটনাটি সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ার পর রাজ্যজুড়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত বৃহস্পতিবার বিকেলে। লখনউয়ের গোমতি নগর থানা এলাকার একটি আইসিআইসিআই ব্যাঙ্ক শাখার বাইরে ঘটে এই নৃশংস ঘটনা। মানস বাজপেয়ী গাড়ি চালিয়ে সোজা তাঁর স্ত্রীর কর্মক্ষেত্রে পৌঁছান। এরপর দিব্যাকে ফোন করে অফিসের বাইরে আসার অনুরোধ জানান। দুজনে কথা বলতে শুরু করার মুহূর্তের মধ্যেই চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং শুরু হয় হাতাহাতি ও ধস্তাস্তি। এর ঠিক পরেই সকলের চোখের সামনে দিব্যাকে লক্ষ্য করে পরপর গুলি চালান মানস। ঘটনাস্থলেই তাঁর রক্তাক্ত অবস্থার পতন ঘটে। এই ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজ ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে আতঙ্কে নিরাপত্তা রক্ষীসহ পথচলতি মানুষ জীবন বাঁচাতে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়ে পালাচ্ছেন।
স্ত্রীকে গুলি করার পর বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় দু’কিলোমিটার দূরে নিজের পৈতৃক বাড়িতে গাড়ি চালিয়ে চলে যান মানস। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, তাঁর শরীর তখন ঘামে ভেজা এবং চোখে মুখে চরম উন্মাদনা। বাড়িতে প্রবেশ করেই তিনি বাইরের দরজায় ছিটকিনী তুলে দেন এবং ঘরের টেলিভিশন সেটে অত্যন্ত উচ্চ স্বরে ‘হনুমান চালিসা’ বাজাতে শুরু করেন। এরপর ঘরের ভেতরে গিয়ে তিনি তাঁর মানসিকভাবে অসুস্থ ছোটবোন শিভাকে গুলি করে হত্যা করেন। পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছিল, শিভার নিয়মিত চিকিৎসা চলছিল এবং মানসের মনে তীব্র দুশ্চিন্তা কাজ করছিল যে, তাঁর নিজের মৃত্যুর পর এই প্রতিবন্ধী বোনের দেখাশোনার দায়িত্ব কে নেবে। বোনকে খতম করার পর লাইসেন্সধারী বন্দুক দিয়ে নিজের মাথাতেও গুলি চালান মানস। গুলির শব্দ শুনে প্রতিবেশীরা ছুটে এসে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতেই ভাই-বোনের রক্তাক্ত নিথর দেহ দেখতে পান। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় গোমতি নগর থানার পুলিশ বাহিনী।
পুলিশি তদন্তে নেমে আরও একটি হাড়হিম করা তথ্য হাতে এসেছে। স্ত্রীকে খুন করার ঠিক পরপরই মানস বাজপেয়ী তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে একটি স্ট্যাটাস আপলোড করেন। সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে লিখেছিলেন, “আমি আমার স্ত্রীকে হত্যা করেছি কারণ সে আমার সাথে প্রতারণা করেছিল। এখন আমাকে নিজেকে এবং আমার বোনকেও শেষ করে দিতে হবে। দিব্যার বোন প্রজ্ঞা এবং তাঁর স্বামী ভরত যাদব এই সমস্ত বিষয় সম্পর্কে সবকিছু জানে।”
উল্লেখ্য, ৩৩ বছর বয়সী দিব্যা মিশ্র ছিলেন জনপ্রিয় ইউটিউবার প্রজ্ঞা মিশ্রের বোন। ২০১৮ সালে পারিবারিকভাবে মানস ও দিব্যার ধুমধাম করে বিয়ে হয়েছিল। তবে গত কয়েক বছর ধরে তাঁদের দাম্পত্যে চরম অশান্তি চলার কারণে তাঁদের কোনো সন্তান ছিল না। সম্পর্কের এই চরম অবনতির জেরে গত এক বছর আগে স্বামী মানসের বিরুদ্ধে ডিভোর্স বা বিবাহবিচ্ছেদের মামলা দায়ের করেছিলেন দিব্যা। এরপর থেকে তিনি আলমবাগের শৃঙ্গার নগরে নিজের পৈতৃক বাড়িতে আলাদা বসবাস শুরু করেন। আদালত সূত্রে জানা গিয়েছিল, মামলাটির চূড়ান্ত ফয়সালা হয়ে পরদিন অর্থাৎ শুক্রবারই আইনগতভাবে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আইনি মুক্ত হওয়ার সেই সোনালী সকাল দেখার আগেই সব শেষ হয়ে গেল। একটি সম্পর্কে বিশ্বাসের অভাব এবং পারিবারিক টানাপোড়েন কীভাবে গোটা একটা পরিবারকে নিমেষের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে পারে, লখনউয়ের এই মর্মান্তিক ঘটনা তার এক নির্মম ও রক্তাক্ত উদাহরণ হয়ে রইল।