“সবকা সাথ, সবকা বিকাশ” থেকে সরাসরি বন্ধুত্ব! সংখ্যালঘু দুর্গে গেরুয়া ঝড়ের মাঝেই বিস্ফোরক মন্তব্য শুভেন্দুর

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বঙ্গ বিজেপির ভরাডুবির পর সায়েন্সসিটি অডিটোরিয়ামে রাজ্য কর্মসমিতির বৈঠকে তৎকালীন রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদারের উপস্থিতিতে তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী কড়া সুরে বলেছিলেন, ‘‘যো হামারি সাথ, যো হামারি সাথ, হাম উনকা সাথ’। ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ বন্ধ কর। সংখ্যালঘু মোর্চার প্রয়োজন নেই।’’ কিন্তু ঠিক দুই বছর বাদে ২০২৬ সালের বিধানসভা উপনির্বাচনের প্রেক্ষাপটে সেই রাজনৈতিক সমীকরণে এল এক যুগান্তকারী ও অভাবনীয় বদল। আরজি করের কর্মসূচি সেরে রেজিনগর যাওয়ার পথে হাসিমুখে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেই ঘোষণা করে দিলেন—‘‘আমাদের ফ্রেন্ডশিপ হয়ে গেছে!’’

পশ্চিমবঙ্গ তথা গোটা দেশে বিজেপির গায়ে সাঁটানো ‘মুসলিম-বিরোধী’ তকমাকে এক লহমায় বদলে ফেলতে এবার সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে সুকৌশলী ও জোরালো থাবা বসিয়েছে গেরুয়া শিবির। পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার প্রায় ৩০% মুসলিম ভোটার। ফলে এই বিরাট অংশকে এড়িয়ে এ রাজ্যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতা দখল অসম্ভব, তা বুঝতে পেরেই উপনির্বাচনের কৌশল সম্পূর্ণ বদলে ফেলে বিজেপি। নন্দীগ্রাম ও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত রেজিনগরের উপনির্বাচনে সংখ্যালঘু মন জয় করতে সরাসরি ময়দানে নামেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রামের প্রচারে তিনি স্পষ্ট আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘‘বন্ধুত্ব করার শুভ দিন ৬ তারিখ। হাত মেলান, বন্ধুত্ব করুন।’’ একইভাবে গত ১ অক্টোবর রেজিনগরের শক্তিপুরের রেলওয়ের মাঠে আয়োজিত জনসভায় তিনি গর্জে উঠে বলেছিলেন, ‘‘হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদ করবেন না। হাত মেলান, বন্ধুত্ব করুন। ৭০/৩০-এর গল্প শুনিয়ে বিভাজন তৈরি করার দিন শেষ। সমস্ত রাষ্ট্রবাদী মানুষ একজোট হয়ে সরকারের পক্ষে ভোট দিন।’’ এমনকি তিনি এও বলেছিলেন যে, ভোটের ফল প্রকাশের দিন বিজয়ী প্রার্থীর সার্টিফিকেটটা তিনি নিজেই কলকাতা নিয়ে আসবেন এবং তার জন্য হেলিকপ্টার প্রস্তুত থাকবে।

অবশেষে শুক্রবার সকালে যখন ইভিএমের সীলমোহর খুলল, তখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সমস্ত হিসেব উল্টে দিয়ে এক অবিশ্বাস্য ছবি সামনে এল। প্রায় ৭২ শতাংশ সংখ্যালঘুpopulated রেজিনগর এবং প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোটযুক্ত নন্দীগ্রাম—উভয় আসনেই পদ্মফুলের ঝড়ে বিরোধীরা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। ভোটের এই চমকপ্রদ ফলাফলের পরেই শুভেন্দুর সেই ‘বন্ধুত্বের বার্তা’ এবং বিগত পাঁচ মাসের জনমুখী উন্নয়ন যে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে গভীর প্রভাব ফেলেছে, তা পরিষ্কার হয়ে গেল। যদিও আম জনতা উন্নয়ন পার্টির (AJUP) প্রধান ও নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবীর এই নির্বাচনে তাঁর পুত্র গোলাম নবী আজাদকে প্রার্থী করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, গণতান্ত্রিক লড়ায়ের পরিবর্তে প্রশাসনিক শক্তি প্রয়োগ করে ভোট লুটের চক্রান্ত হয়েছে এবং তাঁর একাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবুও সমস্ত রাজনৈতিক জল্পনা ও সমীকরণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নন্দীগ্রামের পাশাপাশি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত রেজিনগরেও বিজেপির এই ঐতিহাসিক ও মারকাটারি জয় বাংলার রাজনৈতিক ময়দানে এক সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।