শুধু সামান্য ক্লান্তি বা ওজন কমাই নয়! ক্যানসার মারণ রোগ শরীরে বাসা বাঁধলে রক্তে কোন গোপন পরিবর্তন দেখা দেয়?

ক্যানসারের মতো জটিল ও মারণ রোগের ক্ষেত্রে রোগ যত দ্রুত শনাক্ত করা যায়, চিকিৎসা শুরু করা এবং সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও ততটাই জোরালো হয়। সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই একটি বড় প্রশ্ন ঘোরাফেরা করে—সাধারণ রক্ত পরীক্ষাতেই কি ক্যানসার ধরা পড়া সম্ভব? আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু নির্দিষ্ট রক্ত পরীক্ষা শরীরে ক্যানসারের সম্ভাব্য পরিবর্তনের জোরালো ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে সুনির্দিষ্টভাবে শুধু রক্ত পরীক্ষার ফল দেখে ক্যানসার হয়েছে কি না, তা ১০০ শতাংশ নিশ্চিত করা কখনোই সম্ভব নয়।

ক্যানসার শনাক্তকরণের প্রাথমিক ধাপে চিকিৎসকরা সাধারণত ‘কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট’ বা সিবিসি (CBC) টেস্ট করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এই সাধারণ রক্ত পরীক্ষায় রক্তের লোহিত রক্তকণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা এবং প্লেটলেটের মাত্রা নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা হয়। যদি রক্তের এই কোষগুলির সংখ্যায় কোনো অস্বাভাবিক তারতম্য দেখা যায়, তবে তা লিউকেমিয়া বা লিম্ফোমার মতো কিছু নির্দিষ্ট ব্লাড ক্যানসারের প্রাথমিক ইঙ্গিত হতে পারে। এছাড়াও, শরীরের অন্দরে কোনো মারণ টিউমার বেড়ে উঠলে তা অস্থিমজ্জার স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত করতে পারে। তবে এটি মাথায় রাখা অত্যন্ত জরুরি যে, সিবিসি রিপোর্টে কোনো অস্বাভাবিক ফলাফল পাওয়ার মানেই ক্যানসার নয়। বিভিন্ন সাধারণ সংক্রমণ, অ্যালার্জি বা অন্যান্য শারীরিক জটিলতার কারণেও রক্তের রিপোর্টে এমন পরিবর্তন আসতেই পারে।

এর বাইরেও কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা ‘টিউমার মার্কার’ টেস্ট করার নির্দেশ দিয়ে থাকেন। এই আধুনিক রক্ত পরীক্ষায় রক্তে নির্দিষ্ট কিছু প্রোটিন বা রাসায়নিক পদার্থের মাত্রা মাপা হয়, যা শরীরের কোনো কোনো নির্দিষ্ট ক্যানসারের উপস্থিতি থাকলে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে পিএসএ (PSA), সিএ-১২৫ (CA-125) এবং সিইএ (CEA) এর কিছু অত্যন্ত পরিচিত উদাহরণ। কিন্তু এই ক্ষেত্রেও চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়। কারণ টিউমার মার্কারের মাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পেলেই যে নিশ্চিতভাবে ক্যানসার হয়েছে, এমনটা ভেবে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। অন্যান্য ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা এবং রোগীর ব্যক্তিগত শারীরিক উপসর্গের সঙ্গে মিলিয়েই কেবল এই রিপোর্টের সঠিক ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

ক্যানসার শনাক্তকরণ এবং নিখুঁত চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরির ক্ষেত্রে বর্তমানে আরও একটি অত্যন্ত আধুনিক ও উন্নত পদ্ধতি হলো ‘লিকুইড বায়োপসি’। এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে রক্তে মিশে থাকা ক্যানসার কোষ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া অত্যন্ত ক্ষুদ্র ডিএনএর টুকরো কিংবা সার্কুলেটিং টিউমার ডিএনএ (ctDNA) খুঁজে বের করা হয়। এর ফলে টিউমারের নিজস্ব জেনেটিক বৈশিষ্ট্য বা মিউটেশন সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চিকিৎসকদের হাতে আসে, যা ক্যানসার চিকিৎসায় যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে।

পাশাপাশি, শরীরের কিছু দীর্ঘমেয়াদি লক্ষণ সম্পর্কেও আমাদের প্রত্যেকের সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি। যেমন—দীর্ঘদিন ধরে চলা অস্বাভাবিক ক্লান্তি, কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই হঠাৎ ওজন দ্রুত কমে যাওয়া, বারবার জ্বর আসা বা রাতে অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, শরীরে নতুন কোনো গাঁট বা অস্বাভাবিক ফোলা ভাব দেখা দেওয়া, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, কয়েক সপ্তাহ ধরে পেট বা মূত্রত্যাগের অভ্যাসে বড়সড় পরিবর্তন আসা কিংবা অকারণে রক্তপাত ও সহজেই শরীরে কালশিটে দাগ পড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা থাকলে অবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। তবে মনে রাখা দরকার, এই লক্ষণগুলির অনেকগুলিই ক্যানসার ছাড়াও অন্য সাধারণ কারণেও দেখা দিতে পারে।

পরিশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাধারণ রক্ত পরীক্ষায় ক্যানসারের সম্ভাব্য ঝুঁকি বা ইঙ্গিত মিলতে পারে ঠিকই, কিন্তু রোগ পুরোপুরি নিশ্চিত করার জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বায়োপসি বা টিস্যু পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। সন্দেহজনক কোষ বা টিস্যু ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করার পরেই কেবল ক্যানসারের আসল উপস্থিতি এবং তার সঠিক ধরন নিশ্চিত করা সম্ভব।