বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা হলো। পঁচিশে বৈশাখ, কবিগুরুর জন্মজয়ন্তীর পুণ্যলগ্নে কলকাতার তিলোত্তমা সাক্ষী থাকল এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের। বিশাল ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করলেন শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্য রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘ ১৫ বছরের একাধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে এদিন থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো বিজেপির ঘোষিত ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার।
মঞ্চে শুভেন্দু অধিকারীকে কেন্দ্র করে উন্মাদনা থাকলেও, সকলের নজর ছিল তাঁর মন্ত্রিসভার পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ সহযোগীর দিকে। এঁদের নিয়োগের মাধ্যমেই নতুন সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ও রণকৌশল স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে বনগাঁ উত্তরের বিধায়ক অশোক কীর্তনিয়া এবং জঙ্গলমহলের আদিবাসী নেতা ক্ষুদিরাম টুডুর মন্ত্রিত্ব প্রাপ্তি রাজনৈতিক মহলে বড়সড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কারা এই অশোক কীর্তনিয়া ও ক্ষুদিরাম টুডু?
অশোক কীর্তনিয়া বনগাঁ উত্তর কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নিয়েছেন। তিনি মূলত মতুয়া সম্প্রদায়ের এক প্রভাবশালী মুখ। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, তাঁকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করে বিজেপি সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে তারা তফসিলি জাতি এবং বিশেষ করে উদ্বাস্তুদের কল্যাণে অত্যন্ত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। স্থানীয় সাংগঠনিক রাজনীতি ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অশোকবাবুর এই উত্থান মতুয়া সমাজকে বড় রাজনৈতিক স্বীকৃতি দিল।
অন্যদিকে, জঙ্গলমহলের দাপুটে আদিবাসী নেতা ক্ষুদিরাম টুডুর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানটি ছিল নজরকাড়া। বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বের মতে, প্রান্তিক জেলার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত উন্নয়ন ও পিছিয়ে পড়া আদিবাসী সম্প্রদায়ের অগ্রগতিই টুডুর প্রধান লক্ষ্য হবে।
তৃণমূল পরবর্তী বাংলায় জাতপাতের সমীকরণ
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী নিজে উচ্চবর্ণের প্রতিনিধি হলেও, তাঁর প্রথম দফার মন্ত্রিসভার সদস্যদের নির্বাচন অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন জাত-পাত ও জনজাতি থেকে প্রথম ছয়জন মন্ত্রীকে বেছে নেওয়ার অর্থ হলো—বিজেপি সরকার কোনও বৈষম্য ছাড়াই রাজ্যের সর্বস্তরের মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে চায়।
উল্লেখ্য, নির্বাচনের আগে যখনই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে প্রশ্ন করা হতো যে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন, তিনি সবসময় একটি কথাই বলতেন—”বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী হবে এই মাটিরই কোনো ভূমিপুত্র এবং তিনি বাংলা মাধ্যমেই শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।” আজ শুভেন্দু অধিকারীর শপথের মধ্য দিয়ে শাহের সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ঘটল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। ১৫ বছরের মমতার জমানার পর শুভেন্দুর এই ‘ভূমিপুত্র’ ইমেজ বাংলার মানুষের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হয়, এখন সেটাই দেখার।





