শতক ছোঁয়ার আগেই ইতিহাস! ৯৯তম ডার্বিতে মাইক্রোফোন হাতে কোন রেকর্ড গড়তে চলেছেন প্রদীপ রায়?

ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ডার্বি মানেই বাঙালির হৃদস্পন্দনে এক তীব্র আবেগের বিস্ফোরণ। কখনও ভাইচুং ভুটিয়ার পায়ের জাদুতে লেখা হয়েছে রূপকথা, কখনও কিয়ান নাসিরির হ্যাটট্রিকে বদলে গিয়েছে ম্যাচের মোড়। কখনও আবার লাল-হলুদ জার্সি গায়ে কপিলদেব নিখাঞ্জের মতো বিশ্বজয়ী অধিনায়কও নেমে পড়েছেন বড় ম্যাচের ময়দানে। প্রজন্ম বদলেছে, খেলার গতিপ্রকৃতি বদলেছে, বদলেছে ডার্বির বিশাল মঞ্চও। কিন্তু একটি জিনিস গত পাঁচ দশক ধরে একই রয়ে গিয়েছে—তা হলো এই মহাযুদ্ধের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে থাকা সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর। সেই কিংবদন্তি কণ্ঠস্বরের সামনে আজ এসে উপস্থিত হয়েছে আরও এক অনন্য ঐতিহাসিক মাইলফলক। বারাসতের মাটিতে কলকাতা লিগের ডার্বির মঞ্চে মাইক্রোফোন হাতে ফের একবার প্রতিধ্বনি তুলবেন বর্ষীয়ান ধারাভাষ্যকার প্রদীপ রায়, যা তাঁর দীর্ঘ বর্ণময় কেরিয়ারের ৯৯তম ডার্বি।
সেঞ্চুরির ঠিক দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রদীপ রায়ের পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময়ের দীর্ঘ ধারাভাষ্য জীবনে এটি এক স্মরণীয় অধ্যায়। মাত্র এগারো বছর বয়সে বাবা ও দাদুর হাত ধরে ডার্বি দেখতে গ্যালারিতে আসতেন তিনি। দুজনেই ছিলেন সেকালের পরিচিত ফুটবলার। গ্যালারিতে বসে মুগ্ধ চোখে খেলা দেখা সেই কিশোর কি কখনও কল্পনা করতে পেরেছিল যে একদিন এই রোমাঞ্চকর ম্যাচের গল্পই তাঁর নিজের কণ্ঠের জাদুতে পৌঁছে যাবে বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে? ১৯৭৫ সালে আকাশবাণীর স্পোর্টস সার্ভিস নেটওয়ার্কের হাত ধরে শুরু হয়েছিল তাঁর এই দীর্ঘ পথচলা। কিশোর ভিমানী ও শিবাজী দাশগুপ্তের মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে কাজ করার পর তিনি পাকাপাকিভাবে বাংলা ধারাভাষ্যে মনোনিবেশ করেন। অজয় বসু, পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়, চুনী গোস্বামী থেকে শুরু করে অমল দত্ত—বাংলা ফুটবলের প্রায় সব প্রজন্মের মহাতারকাদের সঙ্গে মাইক্রোফোন শেয়ার করার এক বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেছেন তিনি।
তাঁর এই সুদীর্ঘ স্মৃতির ঝুলিতে জমা হয়ে রয়েছে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখা একাধিক স্মরণীয় ম্যাচ। ১৯৯৭ সালের সেই ফেডারেশন কাপের সেমিফাইনাল, যেখানে যুবভারতীর গ্যালারিতে উপচে পড়েছিল ১ লক্ষ ৩৩ হাজার দর্শকের জনসমুদ্র। ম্যাচের দিন দুপুরের দিকে ধারাভাষ্যের অনুমতি পেয়ে কোন্নগর থেকে স্কুটারে ছুটে আসার সেই রোমাঞ্চকর স্মৃতি আজও তাঁর মনে তাজা। কিংবা ২০০৯ সালের সেই রোমহর্ষক আট গোলের মহারণ, মোহনবাগানের ৫-৩ গোলে জয়, এডে চিডির চোখ ধাঁধানো হ্যাটট্রিক কিংবা ২০২২ সালে কিয়ান নাসিরির দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক—সবকিছুই সাক্ষী রয়েছে তাঁর সাবলীল ধারাভাষ্যের। এমনকী মহামারীকালে দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামে বসেও বাড়ি থেকে নিজের চেনা কন্ঠে ডার্বির উত্তেজনা বাঁচিয়ে রেখেছিলেন তিনি। কার্তিক শেঠের সঙ্গে তাঁর গোল পাওয়ার এক অদ্ভুত মজার যোগসূত্র কিংবা ভারতের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক কপিল দেবের ফুটবল মাঠে নেমে পড়ার সেই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা—সবকিছু মিলিয়ে প্রদীপ রায়ের প্রতিটি ধারাভাষ্য একেকটি জীবন্ত দলিল।
আজ তাই এই ম্যাচটি কেবল আর দশটি সাধারণ ডার্বি নয়। আজকের এই দিনটি তাঁর ধারাভাষ্য জীবনের ৯৯ নম্বর ডার্বির মাইলফলক। তাঁর লক্ষ্য এখন শতক ছোঁয়া, কিন্তু সেঞ্চুরির ঠিক আগের এই ৯৯তম ম্যাচটিও তাঁর কাছে আবেগের দিক থেকে কোনো অংশে কম নয়। প্রযুক্তির হাত ধরে রেডিওর যুগ পেরিয়ে টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দুনিয়ায় মাধ্যম বদলালেও প্রদীপ রায়ের মাইক্রোফোন থামেনি। মাঠের লড়াইয়ে নতুন প্রজন্মের ফুটবলাররা নামবেন, গ্যালারিতে গলা ফাটাবেন তরুণ সমর্থকরা, কিন্তু মাইক্রোফোনের ওপারে থাকা ওই পরিচিত কণ্ঠস্বরই বিগত পাঁচ দশক ধরে বাঙালির ডার্বি সন্ধ্যের একমাত্র অপরিবর্তিত অনুভূতি।