“গেরুয়া মানেই ত্যাগ ও সাহস”, যাদবপুরের দোরগোড়ায় বিজেপি নেতার হাইভোল্টেজ পদযাত্রার নেপথ্যে আসল কারণ কী?

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বামপন্থী ছাত্র সংগঠন এবং আরএসএস অনুমোদিত এবিভিপি-র মধ্যে চলা সংঘাতের রেশ কাটতে না কাটতেই রাজ্য রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর এবং তার আশেপাশের এলাকায় বর্তমানে তীব্র স্লোগান এবং দেওয়াল দখলের লড়াই চলছে। এক পক্ষ দেওয়াল লিখলে, অন্য পক্ষ তা মুছে ফেলে নিজেদের স্লোগান লিখে দিচ্ছে। এই উত্তপ্ত ও চরম রাজনৈতিক আবহের মধ্যেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ এক হাইভোল্টেজ ‘গেরুয়া সম্মান’ যাত্রার নেতৃত্ব দিতে চলেছেন রাজ্যের বিশিষ্ট নেতা শুভেন্দু অধিকারী।

দক্ষিণ কলকাতার গোলপার্ক থেকে বিকেল তিনটেয় এই মেগা পদযাত্রা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে এবং এটি শেষ হবে যাদবপুরের ঐতিহ্যবাহী ৮বি বাসস্ট্যান্ডে। এর আগে গত ২৮ অগস্ট ঠিক এই একই জায়গাতে দশ হাজার সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে সম্পূর্ণ ‘বন্দেমাতরম’ গানটি গাওয়া হয়েছিল। এই কর্মসূচির মূল আয়োজকদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, গেরুয়া রঙের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা মূল্যবোধ, আদর্শ এবং গরিমা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতেই এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই আসন্ন কর্মসূচির প্রচারে ব্যবহৃত একটি চাঞ্চল্যকর পোস্টারে স্পষ্টভাবে লেখা হয়েছে, “গেরুয়া শুধুমাত্র একটি সাধারণ রং নয়। এটি আমাদের ত্যাগ, আত্মোৎসর্গ, বীরত্ব এবং সনাতন ঐতিহ্যের অনন্য প্রতীক।”

উল্লেখ্য, বন্দেমাতরম গাওয়ার সেই পূর্ববর্তী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে বাম এবং তৃণমূল— উভয় রাজনৈতিক দলকেই অত্যন্ত কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। সাধারণ মানুষের চেতনা থেকে জাতীয়তাবাদকে সচেতনভাবে ম্লান হতে দেওয়ার জন্য তিনি ওই দুই দলকে কাঠগড়ায় তুলেছিলেন। পাশাপাশি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে সক্রিয় থাকা তথাকথিত ‘দেশবিরোধী’ শক্তিগুলির তীব্র সমালোচনাও শোনা গিয়েছিল তাঁর মুখে। তিনি প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছিলেন যে, দীর্ঘ দীর্ঘ সময় ধরে এই নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি কমিউনিস্ট মতাদর্শ দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত। আর সেই কারণেই এখানকার তরুণ পড়ুয়াদের স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস, ভারত ও বাংলার গৌরবময় ঐতিহ্য এবং দেশের মহান সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার থেকে সচেতনভাবে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। বামপন্থীদের তীব্র আক্রমণ করে তিনি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছিলেন, “ওদের বাড়িতে বা দপ্তরে আপনি কখনওই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো মহান মনীষীদের ছবি দেখতে পাবেন না।”

একইসঙ্গে তিনি দৃঢ় দাবি করেছিলেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভেতরে এবং বাইরে জাতীয়তাবাদী মেজাজ ও রাজ্যের সুপ্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পালনের সুস্থ রেওয়াজ খুব শীঘ্রই ফিরিয়ে আনা হবে। তাঁর এই বিস্ফোরক মন্তব্যের পরেই অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অতিসক্রিয় হয়ে দেওয়ালের নানা গ্রাফিতি এবং অন্যান্য উসকানিমূলক লেখা মুছে ফেলার প্রশাসনিক পদক্ষেপ করেছিল। কিন্তু দেওয়াল পরিষ্কার করা হলেও তার জেরে স্লোগান-যুদ্ধ একচুলও থামেনি। বরং সাম্প্রতিক কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনা এই আসন্ন ‘গেরুয়া সম্মান’ যাত্রার রাজনৈতিক তাৎপর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কিছুদিন আগে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের একাংশে গায়েবি কায়দায় গেরুয়া রং করে দেওয়ার মারমুখী অভিযোগ ওঠে একদল বিজেপি কর্মীর বিরুদ্ধে। এর ঠিক কিছুদিন পর, একটি শীর্ষস্থানীয় বাংলা দৈনিক সংবাদপত্রের সীমানার পাঁচিলের একাংশও একইভাবে রাঙিয়ে দেওয়া হয়। ওই সংবাদপত্রে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক সংঘর্ষকে সরাসরি ‘গেরুয়া গুন্ডামি’ আখ্যা দিয়ে একটি বিশেষ খবর প্রকাশিত হয়েছিল। এই সমস্ত বিতর্কিত ঘটনাপ্রবাহ এবং রাজনৈতিক উত্তাপের পটভূমিতেই এবার যাদবপুরে এই মেগা পদযাত্রা সংঘটিত হতে চলেছে।