লোকাল ট্রেনের কামরা যেন মন্দির! বিশ্বকর্মা পুজোয় মেতেছেন হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে, কেন জানেন?

বিশ্বকর্মা পুজো মানেই বাঙালির ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ। কিন্তু কর্মব্যস্ত জীবনে সেই পুজোতেও যেন ছেদ পড়ে। তবে এই প্রথাগত ধারণাকে ভেঙে দিলেন নিত্যযাত্রীরা। লোকাল ট্রেনের কামরাতেই ঘট স্থাপন করে, পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ এবং বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে বিশ্বকর্মা পুজোয় মেতে উঠলেন তাঁরা।

লোকাল ট্রেনের কামরায় ঘট স্থাপন!

সাধারণত ট্রেন যাত্রায় আমরা দেখি ঝগড়া, আড্ডা কিংবা খুনসুটি। কিন্তু সেই কামরাতেই যে এক উৎসবের পরিবেশ তৈরি হতে পারে, তা অবাক করে দিল। হাওড়া-কাটোয়া লোকালের নিত্যযাত্রীরা চাঁদা তুলে গত ২০ বছর ধরে এই পুজোর আয়োজন করে আসছেন। এক যাত্রী প্রশান্ত রায় বলেন, “সারা বছর আমরা এই ট্রেনেই হাসি-ঠাট্টা, ঝগড়া-ঝাঁটি করি। আমাদের যাত্রা যাতে নির্বিঘ্ন হয়, সেই কামনায় প্রতি বছর এই পুজো করা হয়।”

অন্যদিকে, বর্ধমান থেকে আসানসোলগামী হাতিয়া মেমু এক্সপ্রেসের নিত্যযাত্রীরাও পিছিয়ে নেই। তাঁরাও ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে এই পুজোয় সামিল হন। যেহেতু চলন্ত ট্রেনে পুরোহিত আনা সম্ভব নয়, তাই বাড়ি থেকে বিশ্বকর্মার ছবি পুজো করিয়ে এনে তা ট্রেনে টাঙানো হয়। তারপর মালা পরিয়ে, ধুপ জ্বালিয়ে চলে আরাধনা।

উৎসাহে ভাটা নেই, তবে বদলেছে চিত্র

আগে এই পুজোয় চলন্ত ট্রেনে পুরোহিত নিয়ে আসা হত, ঢাকের আওয়াজ আর নাচ-গানে মেতে উঠত গোটা কামরা। এখন অনেক যাত্রী অবসর নিয়েছেন বা কর্মক্ষেত্র বদলেছে, ফলে আগের মতো দলবদ্ধভাবে পুজো করা সম্ভব হয় না। তবে আড়ম্বর কমলেও উৎসাহে কোনো ভাটা পড়েনি। নিত্যযাত্রী কুন্তল কুণ্ডু বলেন, “আগে ট্রেনের কামরায় কলা গাছ বেঁধে, ফুল-মালা দিয়ে সাজিয়ে পুজো করা হত। এখন অনেকে অবসর নিয়েছেন বা বদলি হয়েছেন। কিন্তু আমরা একসঙ্গে মিলিত হয়েই পুজোর আনন্দ উপভোগ করি।”

এক পরিবার, যেখানে নেই ধর্মের ভেদাভেদ

এই পুজো শুধু আরাধনাই নয়, এটি এক ধরনের সামাজিক সম্প্রীতিরও প্রতিফলন। নিত্যযাত্রী জ্ঞান শংকর তা জানান, ট্রেনের কামরায় তাঁরা অনেকটা সময় একসঙ্গে কাটান। ফলে এটি তাঁদের কাছে এক আলাদা পরিবারের মতো। রাজেশ গণ আরও বলেন, “আমাদের এই পরিবারে কোনো ধর্মের ভেদাভেদ নেই। আমরা সকলে একসঙ্গে মিলে পুজোর আনন্দে মেতে উঠি।” পুজো শেষে বিতরণ করা হয় লাড্ডু ও সন্দেশ। অনেক যাত্রী মোবাইলে গান চালিয়ে একসঙ্গে নাচে-গানেও মেতে ওঠেন।

লোকাল ট্রেনের নিত্যযাত্রীদের এই অনন্য উদ্যোগ প্রমাণ করে, ইচ্ছা থাকলে যেকোনো পরিস্থিতিতেই উৎসবের আমেজ তৈরি করা সম্ভব।