রানাঘাটের অলিগলি থেকে এশিয়ান গেমস জয়! ৩৩ বছর বয়সে প্রথমবার দেশের জার্সিতে নেমেই সোনা জয়ী পিঙ্কির অবিশ্বাস্য লড়াই!

রানাঘাটের রথতলা বাজারের ছোট্ট গলি থেকে শুরু হওয়া এক রূপকথার লড়াই শেষ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছল জাপানের নাগোয়া এশিয়ান গেমসের সোনা জয়ের মঞ্চে। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে ইরানকে ৩৭-৩৪ পয়েন্টে হারিয়ে ভারতীয় মহিলা কবাডি দলের ঐতিহাসিক সোনা জয়ের অন্যতম রূপকার ছিলেন নদিয়ার মেয়ে পিঙ্কি রায়। দীর্ঘ ১৮ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম, একের পর এক বড় চোট-আঘাত এবং জীবনের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ৩৩ বছর বয়সে প্রথমবার ভারতের নীল জার্সি গায়ে চাপিয়েই দেশকে সোনা এনে দিলেন তিনি।
পিঙ্কির এই সাফল্যের পথচলা কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর মা চণ্ডী রায় থিয়েটারে অভিনয় করে চরম কষ্টের মধ্যেও সংসার টেনে মেয়েকে বড় করে তুলেছিলেন। ২০১৭ সালে সেই মায়ের প্রয়াণের পর শোকের পাহাড় ভেঙে পড়েছিল পিঙ্কির ওপর। কিন্তু মায়ের আজীবন সেই আত্মত্যাগই ছিল তাঁর এগিয়ে চলার মূল শক্তি। এর মাঝেই ২০১৩ সালে হাঁটুর প্রথম বড় অস্ত্রোপচার এবং পরবর্তীতে ২০১৯ সালে সাউথ এশিয়ান গেমসের শিবির চলাকালীন দ্বিতীয়বার হাঁটুর অস্ত্রোপচারের মতো মারাত্মক ধাক্কা সামলাতে হয় তাঁকে। এমনকি ২০২৪ বিশ্বকাপের শিবির থেকে বাদ পড়ার মতো মানসিক আঘাতও সহ্য করতে হয়েছিল। কিন্তু কোনো বাধাই তাঁর জেদ দমাতে পারেনি। ২০১৬ সাল থেকে সাউথ সেন্ট্রাল রেলে যোগ দিয়ে বর্তমানে হায়দরাবাদে সিগন্যাল অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন বিভাগের গুরুদায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি সমান তালে কবাডি অনুশীলন চালিয়ে গিয়েছেন তিনি।
সোনা জয়ের পর রানাঘাটে নিজের পুরনো স্কুলে সংবর্ধনা নিতে এসে একরাশ আবেগ ও পুরনো স্মৃতিতে ভেসে যান পিঙ্কি। যে শ্রেণিকক্ষে বসে একদা তিনি পড়াশোনা করেছেন এবং যে মাটির মাঠ থেকে তাঁর খেলার হাতেখড়ি হয়েছিল, সেখানে ফিরে আসার অনুভূতি ব্যক্ত করে তিনি জানান, স্কুল প্রাঙ্গণে পা রাখতেই তাঁর চোখের জল আর সংবরণ করা যায়নি। অন্য রাজ্যের খেলোয়াড়দের যখন নিজ নিজ স্কুলে এমন বর্ণাঢ্য সম্মান পেতে দেখতেন, তখন থেকেই এই বিশেষ দিনটির স্বপ্ন দেখতেন তিনি। স্কুলের ছোট ছাত্রীদের উদ্দেশে তাঁর স্পষ্ট বার্তা—সাফল্যের জন্য শিক্ষকদের উপদেশ মেনে তাঁদের পেছনে লেগে থাকতে হবে এবং নিজেদের সেরাটা দিয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্কুলের শিক্ষিকা সুস্মিতা রায় স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, ছোটবেলায় সামনের মাঠে পিঙ্কির দাপুটে খেলা আজও তাঁদের চোখে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। সহকর্মী সরিতা ও শেফালী ম্যাডামরা কীভাবে পিঙ্কিকে বিভিন্ন টুর্নামেন্টে খেলতে নিয়ে যেতেন, সেই দিনগুলির কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, পিঙ্কির দেশের হয়ে সোনা জয়ে পুরো স্কুল পরিবার যে আনন্দ পেয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। নিজের এই ঐতিহাসিক জয় প্রয়াত বাবা-মাকে উৎসর্গ করে পিঙ্কি জানিয়েছেন, আগামী বিশ্বকাপ জয়ই তাঁর পরবর্তী জীবনের মূল লক্ষ্য। ভবিষ্যতে নিজের রাজ্যে ফিরে নতুন প্রজন্মের কবাডি প্রতিভা গড়ে তোলাই তাঁর বড় স্বপ্ন।