ডাবল জ্যাকপট পেল ভারত! ৩০ ডলারেরও বেশি ছাড়ে মিলছে কাঁচা তেল, ইউরোপে ডিজেল বিক্রি করে হচ্ছে বাম্পার লাভ

বিশ্বজুড়ে যখন জ্বালানি ও ক্রूड অয়েল নিয়ে চরম অস্থিরতা চলছে, ঠিক তখনই ভারতের মুকুটে যুক্ত হলো এক বিশাল সফলতা। মিডল ইস্টের অশান্তি এবং লোহিত সাগরের সংকটের সুযোগ নিয়ে গ্লোবাল এনার্জি মার্কেটে ভারত কার্যত এক ‘ডাবল জ্যাকপট’ অর্জন করেছে। একদিকে যেমন ভারতীয় সংস্থা ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন (IOC) ইराक থেকে প্রতি ব্যারেল ক্রूड অয়েলে প্রায় ৩২ ডলারের ঐতিহাসিক ডিসকাউন্ট বা ছাড় আদায় করে নিয়েছে, তেমনই অন্যদিকে আমেরিকা ও চিনের সাম্প্রতিক কড়াকড়ির ফলে ইউরোপে তৈরি হওয়া তীব্র ডিজেল সংকটের পুরো ফায়দা তুলছে ভারত। বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরিশোধনকারী দেশ হিসেবে ভারত সস্তায় সেই কাঁচা তেল কিনে নিজেদের অত্যাধুনিক রিফাইনারিতে পরিশোধন করে ইউরোপের বাজারে চড়া দামে ডিজেল বিক্রি করছে।
এই বিশাল সাফল্যের পেছনে রয়েছে নিখুঁত ভূ-রাজনৈতিক কৌশল। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, আইওসি ভিটলের মাধ্যমে প্রায় ২ মিলিয়ন ব্যারেল ইরাকি বাসরা মিডিয়াম ক্রুড অয়েল কিনেছে, যা দুবাই বেঞ্চমার্কের চেয়ে প্রায় ৩২ ডলার কম দামে পাওয়া গেছে। যেখানে সাধারণ পরিস্থিতিতে এই ছাড় মাত্র ২ থেকে ৪ ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, সেখানে ৩২ ডলারের বিশাল ডিসকাউন্টের ফলে এক ধাক্কায় প্রায় ৬৪ মিলিয়ন ডলার বা শত কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত চড়া বিশ্ববাজারেও ইराक কেন ভারতকে এই বিরাট ছাড় দিল?
এর মূল কারণ হরমুজ প্রণালী ও সামুদ্রিক বাণিজ্য পথের তীব্র ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি। যুদ্ধের আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থাগুলি ওই রুটে জাহাজ পাঠাতে ভয় পাচ্ছে এবং বিমার খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। তেল রপ্তানির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ইराक যদি এই তেল বিক্রি করতে না পারে, তবে তাদের অর্থনীতি ধসে পড়বে। এই জটিল পরিস্থিতিতে ভারত এগিয়ে এসে ওমান এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় ‘শিপ টু শিপ’ ট্রান্সফার ও সুদৃঢ় লজিস্টিক ব্যবস্থার মাধ্যমে এই তেল তুলে নেয়। ভারতের এই বড় ঝুঁকির সার্থক ফলই হলো এই রেকর্ড পরিমাণ ছাড়।
অন্যদিকে, এই মুদ্রারই দ্বিতীয় পিঠে রয়েছে ইউরোপের ভয়াবহ ডিজেল সংকট। রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম প্রধান ডিজেল রপ্তানিকারক হলেও যুদ্ধের জमुळे তাদের সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়েছে। পাশাপাশি, চিন নিজেদের ঘরোয়া শক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জ্বালানি রপ্তানির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। অন্যদিকে গত দুই দশকে ইউরোপের নিজস্ব রিফাইনিং ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু ট্রাক, কৃষি যন্ত্রপাতি ও শিল্প কারখানা সচল রাখতে ডিজেলের তীব্র প্রয়োজন রয়েছে। ঠিক এই সংকটের মুহূর্তে ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ভারত। জামনগর থেকে শুরু করে পারাদ্বীপের মতো বিশ্বের অন্যতম সেরা ও উন্নত রিফাইনারিগুলির সাহায্যে ভারত এখন ইউরোপের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং বৃহত্তম ডিজেল সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে। এই সংকটকে সুযোগে পরিণত করে ভারত শুধু নিজের দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাই সুনিশ্চিত করছে না, বরং বিশ্ব বাণিজ্যে নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানকেও অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।