আড়াই-তিন দশকের ব্যবধানে বাংলায় শাসনের হাতবদল হয়েছে, বদলেছে পতাকার রঙ— কিন্তু বদলায়নি এক কলঙ্কিত ইতিহাস, তা হলো রাজনৈতিক হিংসা। ক্ষমতার অলিন্দে পালাবদল হলেও বাংলার মাটি থেকে রক্তের দাগ যেন কিছুতেই মুছে যাচ্ছে না। গতকাল উত্তর ২৪ পরগনায় ভবানীপুরের বিজেপি বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সচিব চন্দ্রনাথ রথের নৃশংস হত্যাকাণ্ড সেই রক্তাক্ত বাস্তবকে আবারও জনসমক্ষে নিয়ে এল। এই ঘটনা ফের প্রশ্ন তুলে দিল— আমরা কি সত্যিই সেই ‘ভয়মুক্ত’ বাংলার দিকে এগোচ্ছি, যার স্বপ্ন দেখেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর?
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির…” কিন্তু আজ বাংলার প্রতিটি কোণে রাজনীতির হিংস্র থাবায় মানুষের শির নত হচ্ছে আতঙ্কে। একসময় ব্রিটিশ শাসনের নিপীড়নের বিরুদ্ধে এই কবিতা ছিল প্রতিবাদের ভাষা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আজ স্বাধীন ভারতেও বাঙালির সেই মহান সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হুমকির মুখে। তফাত শুধু এটুকুই— তখন ছিল বিদেশি শক্তির অত্যাচার, আর আজ নিজের দেশেরই ক্ষমতার লড়াইয়ের নগ্ন রূপ।
বাংলা মানেই শিল্প, সাহিত্য আর আধ্যাত্মিকতার পীঠস্থান। যে মাটিতে জন্মেছেন বিবেকানন্দ, নেতাজি, সত্যজিতের মতো বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্বরা, সেই মাটিই আজ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আগুনে দাউদাউ করে জ্বলছে। ১৯৭৭ থেকে ২০১১ পর্যন্ত দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকের বাম শাসনকাল থেকে শুরু করে তৃণমূলের ১৫ বছরের রাজত্ব— প্রতিবারই ক্ষমতার পালাবদলের সময় মানুষ শান্তির আশা করেছিল। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা। বাম আমলে যে ঘরছাড়া হওয়ার রাজনীতি শুরু হয়েছিল, তৃণমূলের শাসনকালেও তা অব্যাহত ছিল। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি জয়ী হলেও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা যেন কিছুতেই কমছে না। আগে যারা অন্যদের ভয়ের মধ্যে রাখত, আজ তারা নিজেরাই নতুন শক্তির ভয়ে আতঙ্কিত। ভয়ের চরিত্র বদলাচ্ছে, কিন্তু ভয় মুক্ত হচ্ছে না সমাজ।
রবীন্দ্রনাথ ও স্বামী বিবেকানন্দের দর্শন আজ বড় বেশি প্রাসঙ্গিক। গুরুদেব বিশ্বাস করতেন, ভারতের জাতীয়তাবাদ হওয়া উচিত সামাজিক ঐক্যের ওপর ভিত্তি করে, কোনো হিংস্র বা উগ্র জাতীয়তাবাদ নয়। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক দেশ, যেখানে যুক্তি মরুবালিতে পথ হারাবে না। অন্যদিকে, স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগোর মঞ্চ থেকে বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের ডাক দিয়েছিলেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িক হিংসা সভ্যতার শত্রু। বিবেকানন্দ এও শিখিয়েছিলেন যে, অন্যায় সহ্য করা অহিংসা নয়, বরং আত্মরক্ষাই প্রকৃত বীরত্ব।
বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি কি রাজা রামমোহন রায় বা শ্রী অরবিন্দের সমাজ সংস্কারের আদর্শের প্রতিফলন? উত্তরটা নিশ্চিতভাবেই ‘না’। শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ চন্দ্রনাথ রথের মৃত্যু কেবল একটি প্রাণহানি নয়, এটি বাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের ওপর এক চরম আঘাত। যতদিন না ক্ষমতা এবং প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ মানবিকতাকে স্থান দিচ্ছে, ততদিন গুরুদেবের সেই ‘স্বাধীনতার স্বর্গ’ কেবল কবিতার পঙক্তিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।





