যৌনকর্মকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের আইনি ধোঁয়াশা ও বিতর্কের মধ্যেই এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণ দিল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিল, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যদি নিজের ইচ্ছেয় যৌনকর্মে যুক্ত হন, তবে শুধুমাত্র সেই কারণে তাঁকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যাবে না এবং কোনোভাবেই তাঁকে পুলিশি হয়রানির শিকার হতে দেওয়া যাবে না। বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি আর মহাদেবনের বেঞ্চের এই রায় দেশজুড়ে যৌনকর্মীদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় এক নতুন দিশা দেখাল।
আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, যৌনপল্লিতে অভিযান চালানোর সময় স্বেচ্ছায় যৌনকর্মে যুক্ত কোনো মহিলাকে আটক করা যাবে না। এমনকি, ‘উদ্ধার’-এর নামে তাঁদের জোর করে পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানোর চেষ্টাও আইনত বেআইনি। আইটিপিএ (ইমোরাল ট্র্যাফিক (প্রিভেনশন) অ্যাক্ট)-র বিভিন্ন ধারা পর্যালোচনা করে আদালত মনে করিয়ে দিয়েছে, ৭০ বছর পুরনো এই আইনের কোথাও পুলিশকে এমন কোনো ক্ষমতা দেওয়া হয়নি, যার জোরে তারা স্বেচ্ছায় পেশারত প্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে আদালত এও স্পষ্ট করেছে যে, পতিতালয় চালানো বা ব্রথেল পরিচালনার মতো অপরাধমূলক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা পুলিশের থাকবে।
দীর্ঘদিন ধরে মানবপাচার ও বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকার ব্যক্তিদের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য বিভিন্ন মহলে দাবি উঠছিল। সেই প্রেক্ষিতেই আদালতের এই পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যৌনকর্মীদের ‘উদ্ধার’ বা পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে তাঁদের ব্যক্তিগত মতামত এবং সম্মতির বিষয়টিকেই এবার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে বলে জানিয়েছে আদালত। কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যদি নিজের ইচ্ছায় এই পেশায় থাকেন, তবে তাঁকে জোর করে পেশা থেকে সরিয়ে আনার বা বন্দি রাখার কোনো অধিকার রাষ্ট্রের নেই।
আদালতের মতে, পুনর্বাসন হতে হবে পূর্ণাঙ্গ ও স্বেচ্ছামূলক। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো কেবল সেই সব ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় সুযোগ, সুরক্ষা ও সহায়তা প্রদান করা, যাঁরা স্বেচ্ছায় এই পেশা ছেড়ে নতুন জীবন শুরু করতে চান। পুনর্বাসনকে কখনো বাধ্যতামূলক বা চাপিয়ে দেওয়া নীতি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। ইচ্ছের বিরুদ্ধে কাউকে সুরক্ষা গৃহে রাখা বা পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকারের সরাসরি পরিপন্থী।
বর্তমান আইনি কাঠামোয় একটি বড় ত্রুটির দিকে আঙুল তুলে আদালত বলেছে, অনেক সময় পাচারের শিকার ভুক্তভোগী এবং স্বেচ্ছায় যৌনকর্মে যুক্ত ব্যক্তিকে একই মাপকাঠিতে বিচার করা হয়। কিন্তু এই ‘একই মাপের’ পদ্ধতি বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে একেবারেই মানানসই নয়। সুপ্রিম কোর্টের এই রায় স্পষ্ট বার্তা দিল যে, আইন প্রয়োগের নামে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করা যাবে না। যৌনকর্মীদের ক্ষেত্রে তাঁদের সম্মতি, আত্মমর্যাদা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকেই এবার থেকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই রায় কেবল আইনি রক্ষাকবচ নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।





