মেডিকো-লিগ্যাল টেস্টে সম্মতি নেই নির্যাতিতার, IIM জোকা-কাণ্ডে রহস্য ঘনাচ্ছে বাবার বয়ানেও

হরিদেবপুর থানায় ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের হওয়ার ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও আইআইএম জোকা কাণ্ডের নির্যাতিতা তরুণীর এখনও মেডিকো-লিগ্যাল পরীক্ষা করানো যায়নি। পুলিশ সূত্রে দাবি, এই পরীক্ষা করাতে হলে নির্যাতিতার সম্মতি প্রয়োজন, যা এখনও মেলেনি। কেন এই অনীহা, তা নিয়ে ধন্দে রয়েছেন তদন্তকারীরা।

লালবাজারের এক আধিকারিক রবিবার জানিয়েছেন, “ধর্ষণের ঘটনার ক্ষেত্রে যত দ্রুত সম্ভব নির্যাতিতার মেডিকো-লিগ্যাল টেস্ট করানো গেলে মামলার ট্রায়ালের সময় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এক্ষেত্রে আমরা নির্যাতিতার সম্মতির জন্য অপেক্ষা করছি। যদি উনি সম্মতি না-দেন, তাহলে সেটাও আমরা আদালতে জানাব। বাদবাকি তদন্তে কী পাওয়া গেল, সেই তথ্যও কোর্টকে লিখিতভাবে জানানো হবে।”

অভিযুক্ত পুলিশ হেফাজতে, সিট গঠন:
আইআইএম, ক্যালকাটার বয়েজ় হস্টেলের ১৫১ নম্বর রুমে তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়ার পর শনিবার সেখানকার দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র পরমানন্দ মহাবীর তোপ্পান্নাওয়ারকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। আদালত তাকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছে। তদন্ত সঠিক ভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে রবিবার ৯ সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করা হয়েছে। তাঁরা অভিযুক্তকে জেরার পাশাপাশি আরও কয়েকটি বিষয় জানার চেষ্টা করছেন।

যেমন— অভিযুক্ত ও নির্যাতিতার মোবাইল পরীক্ষা করে দেখতে চান তদন্তকারী অফিসারেরা। ওই যুবক তার মোবাইলে নির্যাতিতার আপত্তিকর ভিডিও ও ছবি তুলে রেখেছিল কি না, তা জানতে ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে ওই ম্যানেজমেন্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন চত্বরের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজও পরীক্ষা করা হবে।

নির্যাতিতার বাবার চাঞ্চল্যকর বয়ান:
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে নির্যাতিতার বাবার বয়ান নিয়ে। শুক্রবার রাতে নির্যাতিতা নিজে হরিদেবপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেও, শনিবার সংবাদমাধ্যমের সামনে তাঁর বাবা যে বিবৃতি দিয়েছেন, তাতে বেশকিছু প্রশ্ন ও সংশয়ের জায়গা তৈরি হয়েছে।

বাবার দাবি, “কেউ অত্যাচার করেনি, মেয়ে ফিট।” তিনি বলেছেন, তাঁর মেয়ের উপর কোনও অত্যাচার হয়নি অথবা কেউ মেয়ের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারও করেনি। তিনি বা নির্যাতিতা যতক্ষণ না পুলিশ বা আদালতের কাছে এসে নতুন করে কোনও বয়ান দিচ্ছেন, ততক্ষণ পুলিশ অভিযুক্তকে জেরার পাশাপাশি টেকনিক্যাল এবং সায়েন্টিফিক এভিডেন্সের উপরে ভরসা করে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

মেডিকো-লিগ্যাল টেস্টের গুরুত্ব ও চ্যালেঞ্জ:
পুলিশ সূত্রের বক্তব্য, যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের অভিযোগ উঠলে মেডিকো লিগ্যাল পরীক্ষাটা দ্রুত করানো অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে নির্যাতিতার যৌনাঙ্গ–সহ শরীরের যাবতীয় আঘাতের পাশাপাশি ভেজাইনাল সোয়াব-সহ প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সেই নমুনা পাঠানো হয় ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য।

ফরেন্সিক মেডিসিনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রদীপ ঘোষ বলেন, “মেডিকো লিগ্যাল টেস্ট যত দেরি হবে, প্রমাণ নষ্টের আশঙ্কা তত বেড়ে যাবে।” পুলিশ সূত্রের খবর, ঘটনার দিন ওই তরুণী যে জামা-কাপড় পরেছিলেন, তা-ও সম্পূর্ণভাবে সংগ্রহ করা যায়নি, যা তদন্তে জটিলতা বাড়াচ্ছে।

নির্যাতিতার লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী পুলিশ মনে করছে, অভিযুক্ত সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিংয়ের কথা বলে ওই তরুণীকে বয়েজ় হস্টেলে ডেকেছিল। ঠিক কী কারণে তরুণীকে সে দিন ডেকে পাঠানো হয়েছিল, কেনই বা গেটের লগবুকে তাঁর নাম এন্ট্রি করানো হলো না, হস্টেলের ঘরে তরুণীর উপর নির্যাতন চালানো হলে আশপাশের অন্য কেউ তা জানতে পেরেছিলেন কি না— এই সব প্রশ্নের আপাতত উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন তদন্তকারী অফিসাররা।

শনিবার আদালতে সরকারি কৌঁসুলি দাবি করেছিলেন, অভিযুক্ত প্রভাবশালী। প্রভাব খাটিয়ে নির্যাতিতাকে সে ভিতরে নিয়ে গিয়েছিল। এক্ষেত্রে আইআইএম–এর ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন, তা জানতে আইআইএম কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠানো হয়েছে সিট-এর তরফে। ঘটনার সত্য উদঘাটন এবং বিচার নিশ্চিত করা এই বিশেষ তদন্তকারী দলের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।