মৃত মানুষের অ্যাকাউন্টে ঢুকছে আবাসের টাকা! মঙ্গলকোটে সরকারি প্রকল্পের নামে এ কোন মহালোকচুরি?

পূর্ব বর্ধমানের মঙ্গলকোটের ঝিলু ২ নম্বর পঞ্চায়েতের নওয়াপাড়া গ্রামে আবাস যোজনা প্রকল্পের ঘর ও টাকা বরাদ্দ ঘিরে এক চাঞ্চল্যকর ও ভয়ঙ্কর দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। বিগত সরকারের আমলের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে রাজ্য রাজনীতি যখন উত্তপ্ত, ঠিক তখনই নতুন করে এই আবাসের দুর্নীতি সাধারণ মানুষের চোখ কপালে তুলে দিয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১৯-২০ এবং ২০২০-২১ অর্থবর্ষে আবাস যোজনা প্রকল্পের জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে সার্ভে করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ বছর পেরিয়ে গেলেও বহু প্রকৃত এবং দুঃস্থ উপভোক্তা মাথার ওপর ছাদ পাননি। অথচ সরকারি পোর্টালে তাঁদের নামেই ঘর বরাদ্দ এবং টাকা তোলার ভুয়া তথ্য দেখানো হচ্ছে।
এই ঘটনার জেরে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো মৃত ব্যক্তিদের নামে ঘর বরাদ্দ হওয়ার অভিযোগ। এলাকার বাসিন্দা মৃত মোল্লা মমিজুলের পরিবার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে তিনি জীবদ্দশায় কখনও আবাসের ঘরের জন্য কোনো আবেদনই করেননি। অথচ সরকারি নথিতে তাঁর নামেই ঘর বরাদ্দ দেখানো হয়েছে এবং ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা তোলার তথ্যও সামনে এসেছে। পরিবারের ক্ষোভ, সেই টাকা বাস্তবে অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে চলে গিয়েছে। ঠিক একই ধরনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে মৃত হামিদা বিবিকে নিয়েও। সরকারি পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী তাঁর নামে ঘর এবং টাকা বরাদ্দ দেখানো হলেও পরিবারের দাবি, সেই টাকা গ্রামেরই রফিক শেখের নামে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। যদিও অভিযুক্ত রফিক শেখ দাবি করেছেন যে তাঁর অ্যাকাউন্টে কোনো সরকারি টাকা ঢোকেনি।
কেবল মৃত ব্যক্তিরাই নন, চরম দুর্দশার শিকার জীবিত গরিব মানুষও। আজ পর্যন্ত কাঁচা মাটির কুঁড়েঘরে বসবাস করা মানসুরা বিবি নামের এক উপভোক্তার নামও এই আবাসের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, তিনি আজও কোনো সরকারি সাহায্য বা পাকা ঘরের মুখ দেখেননি। উল্টোদিকে তাঁর নামে বরাদ্দ হওয়া বিপুল পরিমাণ ঘরের টাকা অন্য কারোর পকেটে বা অ্যাকাউন্টে চলে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই অভিনব ও ভয়াবহ দুর্নীতির ফলে বর্তমানে চরম বিপাকে পড়েছেন প্রকৃত এবং গরিব উপভোক্তারা। যখনই তাঁরা নতুন করে আবাসের ঘরের জন্য আবেদন করতে যাচ্ছেন, তখনই তাঁদের জানানো হচ্ছে যে সরকারি নথিতে তাঁদের নামে ইতিমধ্যেই ঘর বরাদ্দ হয়ে রয়েছে। ফলে বাস্তবে একফোঁটা সাহায্য না পেয়েও নতুন করে ঘর পাওয়ার আইনি ও সরকারি সুযোগ হারাচ্ছেন তাঁরা। এই পরিস্থিতিতে এলাকার প্রতারিত ও বঞ্চিত মানুষেরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। তাঁরা অবিলম্বে পঞ্চায়েত এবং ব্লক প্রশাসনের কাছে লিখিতভাবে আবেদন জানিয়ে দাবি তুলেছেন যে, হয় তাঁদের অবিলম্বে মাথার ওপর পাকা ছাদ বা ঘর দিতে হবে, নতুবা তাঁদের নামে জালিয়াতি করে আত্মসাৎ করা সমস্ত টাকা অবিলম্বে ফেরত দিতে হবে।
অন্যদিকে, এই বিশাল দুর্নীতি প্রকাশ্যে আসতেই শাসক দলের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে বিরোধী দল বিজেপি। বিজেপির তরফ থেকে সরাসরি অভিযোগ করা হয়েছে যে, তৃণমূল পরিচালিত স্থানীয় পঞ্চায়েতের মদতেই প্রকৃত ও গরিব উপভোক্তাদের চরমভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে। গরিবের হক মেরে সেই সরকারি প্রকল্পের টাকা তৃণমূলের দলীয় নেতা এবং তাদের আত্মীয়-পরিজনদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই পুরো কেলেঙ্কারির সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ সহ বিষয়টি ইতিমধ্যেই স্থানীয় পঞ্চায়েত এবং বিডিও (BDO) অফিসে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে বলে দাবি করেছে বিজেপি নেতৃত্ব।