“মুসলিম ভক্তের মাছের ভোগ দেওয়া হয় দেবীকে!”-কিরীটেশ্বরী মন্দিরে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের নজির

একান্ন সতীপীঠের অন্যতম মুর্শিদাবাদের নবগ্রামের কিরীটেশ্বরী মন্দির দুর্গাপূজার অষ্টমীতে রাজরাজেশ্বরী রূপে পূজিত হন। এই মন্দিরের অন্যতম বিশেষত্ব হলো, এখানে দেবীর কোনো মূর্তি নেই— শিলা মূর্তিকেই দেবী রূপে পুজো করা হয়। হাজার বছরেরও বেশি পুরনো এই মন্দির ঘিরে রয়েছে রহস্যময় আচার এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের এক বিরল নজির।
প্রতি বছর অষ্টমীতে পুজোর আগে দেবী শিলাকে স্নান করানো হয়। তবে এই স্নানপর্বে থাকে কঠোর নিয়ম। স্নান করানোর ভার থাকে মন্দিরের পুরোহিত নেপাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর। স্নানপর্ব শুরুর আগে পুরোহিতের চোখ কাপড়ের ফেট্টি দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়, যাতে তিনি মায়ের রূপ দর্শন করতে না পারেন। এ সময় গর্ভগৃহের দরজাও বন্ধ রাখা হয়।
পুজোর কমিটির সদস্য মনোতোষ অধিকারী জানান, প্রথমে দশ মৃত্তিকা লেপন করার পর ব্রহ্মপুত্র, মানস সরোবর, ভাগীরথী সহ সাত সমুদ্রের জলে গোলাপজল মিশিয়ে তা দিয়ে দেবীকে স্নান করানো হয়। এরপর নতুন লাল বেনারসি শাড়ি ও বিভিন্ন অলঙ্কারে সাজানোর পর শুরু হয় মূল পুজো ও যজ্ঞ।
কিরীটেশ্বরী মন্দিরের এক অভূতপূর্ব ঐতিহ্য হলো, অষ্টমীতে দেবীকে মৎস্য ভোগ দেওয়া হয়, আর সেই মাছ আসে প্রয়াত আবদুল হাকিমের বাড়ির পুকুর থেকে। অষ্টমীর সকালে জাল ফেলে মাছ ধরা হয় এবং ওই পরিবারের একজন সদস্য স্নান করে নতুন পোশাকে সেই মাছ মন্দিরে নিয়ে আসেন। এই মাছের ভোগই মাকে দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে।
যদিও এই প্রথা শুরুর ইতিহাস অজানা, তবে মনোতোষ অধিকারী জানান, আবদুল হাকিম ও তাঁর পরিবার কিরীটেশ্বরী মায়ের একনিষ্ঠ ভক্ত। মন্দিরের উন্নতির জন্য তাঁদের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। হাকিম সাহেব মন্দির লাগোয়া দু’কাঠা জমি মন্দির কর্তৃপক্ষকে দান করেছিলেন এবং তাঁর প্রয়াণের পর তাঁর ছেলেরাও সেই জমি দানপত্র করে দেন।
আবদুল হাকিমের নাতি মহম্মদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, “আমাদের পরিবারের লোকজনের কিরীটেশ্বরী মায়ের প্রতি বিশেষ দুর্বলতা রয়েছে। নামাজ-রোজা যেমন করি, তেমনি কিরীটেশ্বরী মাকেও মানি।” মন্দির কমিটির প্রাক্তন সভাপতি ধীরেন্দ্রনাথ যাদব বলেন, “ওই পরিবারের লোকজন শুধু জমিই দান করেননি, দর্শনার্থীদের জন্য সিরাজুল ইসলাম নিজের অবসরকালীন টাকায় জলের ট্যাঙ্ক নির্মাণ করেছেন। এটাই আমাদের ভারতবর্ষের চিরায়ত ঐতিহ্য।”
হিন্দু পুরাণ মতে, বিষ্ণু যখন সুদর্শন চক্র ছুড়ে সতীর দেহ টুকরো করেন, তখন দেবীর কিরীটকণা বা মুকুটের টুকরো উড়ে এসে নবগ্রামে পড়েছিল। যদিও কেউ কেউ মনে করেন এখানে দেবীর ললাট বা কপাল পড়েছিল। হাজার বছরেরও বেশি পুরনো এই মন্দির একসময় রানি ভবানী রক্ষণাবেক্ষণ করতেন এবং প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া মন্দিরটি উনবিংশ শতকে লালগোলার মহারাজা দর্পনারায়ণ নতুন করে গড়েন। বর্তমানে মন্দির রক্ষণাবেক্ষণ কমিটিতে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের সদস্যরাই রয়েছেন।
অষ্টমীর দিন কিরীটেশ্বরী মন্দিরে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষের ভোগ রান্না করা হয় এবং পুজোর পরে সেখানে পাত পেড়ে খাওয়ানো হয়। এই দিনে বীরভূম, মালদহ, নদিয়া সহ মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের ঢল নামে।