মুর্শিদাবাদের বহিষ্কৃত তৃণমূল নেতা হুমায়ুন কবীরের বেলডাঙাতে ‘বাবরি মসজিদ নির্মাণে’র ঘোষণার পর রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন মোড় এসেছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই ধর্মীয় ইস্যুটি রাজনীতির গতিপথকে অন্য দিকে চালিত করেছে। ইটিভি ভারত সরেজমিনে মুর্শিদাবাদ ঘুরে সেখানকার বর্তমান চালচিত্র তুলে ধরেছে।
নবাবের শহরে জীবন সংগ্রাম বনাম ধর্মীয় আবেগ
মুর্শিদাবাদ জেলার জলঙ্গি বিধানসভার বারোমাসিয়া গ্রামের মতো বহু এলাকায় অধিকাংশ মানুষজনই সংখ্যালঘু। এখানকার বাসিন্দারা চাষবাস, দিনমজুরি বা পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। গ্রামে রাস্তা নেই, কাজ নেই, ১০০ দিনের কাজ বন্ধ, এবং পড়াশোনার খরচ বৃদ্ধির কারণে বাল্যবিবাহের সংখ্যা সর্বাধিক।
স্থানীয়রা জানেন না যে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের ব্যবস্থা করা সরকারের দায়িত্ব। অথচ, তাঁরা বেলডাঙাতে বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন বা কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে গীতাপাঠের মহা-আয়োজন সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল।
-
জীবন-যন্ত্রণাকে ভুলিয়ে দিয়েছে ধর্মের মোহ: সাকিরুল মণ্ডল বা গৌতম ইব্রাহিমদের মতো মানুষেরা রোজকার জীবন যুদ্ধে লড়লেও তাঁরা প্রশাসন বা জনপ্রতিনিধিদের প্রশ্ন করছেন না। বরং, রাজনীতির কারবারিরা তাঁদের মন্দির-মসজিদ নিয়ে মাতিয়ে রেখেছেন, যার ফলস্বরূপ জীবন যন্ত্রণাকে পিছনে ঠেলে তাঁরা ধর্মের মোহে নিজেদের মধ্যেও বিভাজন তৈরি করছেন।
বাবরি ইস্যুর প্রভাব এবং স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
হুমায়ুন কবীরের নেতৃত্বে বেলডাঙাতে বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছে। বসিরহাট, ভাঙড়, ভাতার, পলাশি, কালীগঞ্জ থেকে ট্রাক ভর্তি করে ইট-সিমেন্ট যাচ্ছে সেখানে। উপচে পড়ছে দান পেটি।
-
হুমায়ুন ফ্যাক্টর: স্থানীয় মানুষের কাছে হুমায়ুন এখন আবেগের কেন্দ্রবিন্দু। তাঁদের অনেকের প্রশ্ন: “দিদি (মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) একটার পর একটা মন্দির করছেন। মসজিদ করলে অপরাধ কীসের? মসজিদ করা যদি হুমায়ুনের অপরাধ হয়, তাহলে আমরা হুমায়ুনকেই ভোট দেব। দিদিকে তাড়াব।“
-
তৃণমূলের উদ্বেগ: স্থানীয় তৃণমূল শিবিরের আশঙ্কা, ভরতপুর, বেলডাঙা, রানিনগর-সহ একাধিক এলাকা হুমায়ুনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ফলে এই বিশাল এলাকার কয়েকটি বিধানসভা তৃণমূলের হাতছাড়া হতে পারে। এছাড়া, আসাদউদ্দিন ওয়াইসির মিমের সঙ্গে হুমায়ুন জোট বাঁধলে মুসলিম ভোট ব্যাংক ধরে রাখা তৃণমূলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
রাজনীতিবিদদের কৌশল
-
তৃণমূল কংগ্রেস: দল থেকে হুমায়ুনকে বহিষ্কার করলেও, স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের উদ্বেগ বাড়ছে।
-
বিজেপি: গেরুয়া শিবির মনে করছে, হুমায়ুনের বিদ্রোহী সত্তা এবং বেলডাঙার বাবরি মসজিদকে ঘিরে মুসলিমদের আবেগ হিন্দু ভোট ব্যাংককে এককাট্টা করতে সুবিধা দেবে।
-
কংগ্রেস ও বামেরা:
-
অধীররঞ্জন চৌধুরী: তিনি বলছেন, “দিদি আর মোদির অদ্ভুত মিল, দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি করছে বিজেপি, সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলায় বিভাজনের রাজনীতি করছে তৃণমূল।”
-
মহম্মদ সেলিম: তিনি স্পষ্ট বলেন, “সরকারের কাজ রাস্তা, স্কুল করা। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ফলে কালোবাজারি বেড়ে গেল…আমরা এই বিভাজনের বিরুদ্ধে।” সিপিএম ‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’-র মাধ্যমে এবং অধীররঞ্জন চৌধুরী ‘মিশন স্বরাজ’-এর মাধ্যমে মৌলিক প্রশ্নগুলিকে সামনে আনার চেষ্টা করছেন।
-
উপসংহার
কেন্দ্রীয় বঞ্চনা, এসআইআর-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে ছাপিয়ে গিয়ে আগামী দিনে এই মন্দির-মসজিদ নির্মাণ ইস্যুই বঙ্গ রাজনীতির নিউক্লিয়াস হয়ে ওঠে কি না, সেই দিকেই এখন সকলের নজর থাকবে।