বৃষ্টিভেজা বিকেল মানেই ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা আর সঙ্গে গরম-গরম মুচমুচে সিঙ্গারা (Samosa)। ভারতের রাস্তাঘাটে, অলিতে-গলিতে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সাশ্রয়ী কোনো বিকেলের জলখাবার যদি থেকে থাকে, তবে তা নিঃসন্দেহে সিঙ্গারা। কিন্তু যে সিঙ্গারাকে আমরা খাঁটি ভারতীয় বা বাঙালি খাবার বলে বুক ফুলিয়ে দাবি করি, তার ইতিহাস কিন্তু অন্য কথা বলছে। আপনি কি জানেন, আমাদের এই অতি প্রিয় সিঙ্গারা বা সমোসা আসলে ভারতের আবিষ্কারই নয়? এর রাজকীয় উত্থান এবং সাম্রাজ্য বিস্তার ঘটেছিল মূলত দিল্লির বুকে, মুঘল এবং সুলতানি আমলের হাত ধরে।
দিল্লিকে কেন সিঙ্গারার রাজধানী বলা হয় এবং কীভাবে মধ্য এশিয়ার এই রাজকীয় খাবারটি আজকের মডার্ন যুগের সেরা স্ট্রিট ফুড হয়ে উঠল? আসুন জেনে নেওয়া যাক সিঙ্গারার সেই লোভনীয় ইতিহাস।
মধ্য এশিয়া থেকে দিল্লির সুলতানি দরবারে আগমন
সিঙ্গারার আদি জন্মভূমি কিন্তু ভারত নয়, বরং মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য। প্রাচীন ফার্সি ভাষায় একে বলা হতো ‘সাম্বোলাগ’ (Sambosag), যার অর্থ ত্রিকোণাকৃতির পেস্ট্রি। ত্রয়োদশ বা চতুর্দশ শতাব্দীতে দিল্লির সুলতানি আমলে মধ্যপ্রাচ্যের বাবুর্চিরা যখন রাজকীয় রান্নাঘরে কাজ করতে আসেন, তখন তাঁরাই এই খাবারটি ভারতে নিয়ে আসেন।
দিল্লির বিখ্যাত সুফি কবি আমির খসরু (১২৫৩-১৩২৫ খ্রিষ্টাব্দ) তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছিলেন যে, দিল্লির রাজপুত্র ও অভিজাতরা মাংস, ঘি ও পেঁয়াজ দিয়ে তৈরি এক ধরণের বিশেষ ‘সমোসা’ খেতে দারুণ পছন্দ করতেন। এমনকি বিখ্যাত মরক্কোর পরিব্রাজক ইবন বতুতাও চতুর্দশ শতাব্দীতে সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের দরবারে মাংস, পেস্তা, বাদাম ও আখরোট ঠাসা এই ‘সাম্বুশাক’ পরিবেশনের কথা বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন।
মুঘল আমলের রাজকীয় রেসিপি: ছিল না কোনো আলু!
মুঘল সম্রাট আকবরের আমত্য আবু’ল ফজল রচিত ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘আইন-ই-আকবরি’-তেও সিঙ্গারার উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে চমকে যাওয়ার মতো তথ্য হলো, ৫০০ বছর আগের সেই মুঘল সিঙ্গারায় কিন্তু কোনো ‘আলু’ ছিল না! কারণ তখনও ভারতে আলুর আগমনই ঘটেনি। মুঘলদের সিঙ্গারায় থাকত কিমা করা মাংস, মশলা এবং প্রচুর পরিমাণে ড্রাই ফ্রুটস বা শুকনো ফল। এটি মূলত পোলাও খাওয়ার আগে একটি রাজকীয় স্টার্টার বা চাটনি হিসেবে পরিবেশন করা হতো।
সিঙ্গারায় আলুর এন্ট্রি: সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে পর্তুগিজরা যখন ভারতে ‘বাতাতা’ বা আলু নিয়ে আসে, তখন ভারতের সাধারণ বাবুর্চিরা মাংসের পরিবর্তে আলুর পুর দেওয়া শুরু করেন। আর এই একটি পরিবর্তনই সিঙ্গারার ইতিহাস বদলে দেয়, খাবারটি রাজপ্রাসাদ থেকে নেমে আসে সাধারণ মানুষের প্লেটে।
দিল্লি কেন সিঙ্গারার অঘোষিত রাজধানী?
আজকের মডার্ন যুগেও কেন দিল্লিকেই সিঙ্গারার আসল সাম্রাজ্য বলা হয়, তার পেছনে রয়েছে কয়েকটি অকাট্য কারণ:
সর্বোচ্চ ব্যবহার: ফুড ডেটা অনুযায়ী, গোটা ভারতের মধ্যে দিল্লিতেই প্রতিদিন সবচেয়ে বেশি পরিমাণ সিঙ্গারা বিক্রি ও খাওয়া হয়।
ঐতিহ্যবাহী দোকান: দিল্লির পাহারগঞ্জের ‘মুন্নি লাল হালওয়াই’ (১৯৪০-এর দশক থেকে) কিংবা কনট প্লেসের ‘দি অ্যাম্বাসি’-র মতো আইকনিক দোকানগুলো গত ৭০-৮০ বছর ধরে সিঙ্গারার আদি স্বাদ ধরে রেখেছে।
আধুনিক রূপান্তর: মডার্ন দিল্লিতে এখন শুধু আলুর সিঙ্গারা নয়; চিজ সিঙ্গারা, চকোলেট সিঙ্গারা, চাউমিন সিঙ্গারা থেকে শুরু করে ‘সমোসা চাট’-এর মতো ফিউশন স্বাদের রাজত্ব চলছে।
মুঘল আমলের শাহী কিমা সিঙ্গারা থেকে শুরু করে আজকের মডার্ন যুগের ক্রিস্পি আলুর সিঙ্গারা— যুগ বদলেছে, স্বাদ বদলেছে, কিন্তু ভোজনরসিকদের মনে সিঙ্গারার রাজত্ব আজও অটুট রয়েছে।





