মহালয়ার সকালে চোখ ধাঁধানো দৃশ্য! উত্তরবঙ্গের ঐতিহাসিক রাজবাড়ির পুজোয় কোন প্রাচীন রীতি দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়?

সময়ের স্রোতে বদলেছে যুগ, হারিয়ে গিয়েছে রাজত্বের জৌলুস, ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়েছে কত না অধ্যায়। তবু আজও অমলিন এক ঐতিহ্য। এক টুকরো সোনার দুর্গাকে ঘিরে ৫১৭ বছরের ইতিহাস, বিশ্বাস আর রাজকীয় আভিজাত্যের মেলবন্ধন। মহালয়ার পুণ্যলগ্নে দেবীর চক্ষুদানের মধ্য দিয়ে ফের শারদোৎসবের আবহে সেজে উঠল জলপাইগুড়ির ঐতিহাসিক বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ি।

প্রাচীন রীতি, নিষ্ঠা আর পরম্পরাকে সঙ্গী করেই শুরু হল উত্তরবঙ্গের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এই দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি। বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির দুর্গাপুজো শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে উত্তরবঙ্গের ইতিহাস, রাজপরিবারের উত্তরাধিকার এবং কয়েক শতাব্দীর সাংস্কৃতিক পরম্পরা। কথিত রয়েছে, কোচবিহার রাজপরিবারের সদস্য বিশ্ব সিংহ এবং বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির সদস্য শিষ্য সিংহের হাত ধরেই এই ঐতিহাসিক পুজোর সূচনা হয়েছিল। সেই থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহমান এই পুজো আজও স্বমহিমায় উজ্জ্বল।

রাজবাড়ির পুজোর অন্যতম আকর্ষণ দেবীর সোনার মূর্তি। মহালয়ার সকালে সেই সোনার দুর্গার চক্ষুদান যেন ভক্তদের কাছে এক বিশেষ আবেগের মুহূর্ত। দেবীর চোখে তুলির স্পর্শের সঙ্গে সঙ্গেই যেন প্রতীকীভাবে জেগে ওঠে পুজোর আবহ। পিতৃপক্ষের অবসান আর দেবীপক্ষের সূচনায় রাজবাড়ির আঙিনায় মিশে যায় ভক্তি, আবেগ ও ইতিহাসের অনুরণন। এই পুজোর আচার-অনুষ্ঠানেও রয়েছে স্বাতন্ত্র্য। কালিকাপুরাণের বিধি মেনে সম্পন্ন হয় পুজো। দেবী দুর্গার পাশাপাশি পূজিত হন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। সেই সঙ্গে জয়া, বিজয়া, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর এবং মহামায়া চণ্ডীর আরাধনাও এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রাচীন শাস্ত্রীয় বিধি ও রীতিনীতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে আজও এখানে পুজোর পরম্পরা পালন করা হয়।

পাঁচ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে কত পরিবর্তনের সাক্ষী থেকেছে বৈকুণ্ঠপুরের রাজবাড়ি। বদলেছে সমাজ, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা, হারিয়ে গিয়েছে অতীতের বহু রাজকীয় স্মৃতি। কিন্তু রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর ধারাবাহিকতা আজও ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের সেতুবন্ধন তৈরি করে রেখেছে। এই পুজোকে ঘিরে রয়েছে স্থানীয় মানুষের আবেগ, শ্রদ্ধা এবং শিকড়ের প্রতি টান। মহালয়ার চক্ষুদান তাই এখানে নিছক একটি ধর্মীয় রীতি নয়। এটি যেন অতীতকে নতুন করে ছুঁয়ে দেখার মুহূর্ত, উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যকে ফিরে পাওয়ার এক আবেগঘন উপলক্ষ। সোনার দুর্গার চোখে প্রাণ প্রতিষ্ঠার সেই প্রতীকী মুহূর্তের মধ্য দিয়েই বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়িতে শুরু হল শারদোৎসবের কাউন্টডাউন। সোনার দুর্গা, ৫১৭ বছরের ইতিহাস আর মহালয়ার পবিত্র মুহূর্ত সব মিলিয়ে বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির দুর্গাপুজো আজও প্রমাণ করে, সময় বদলালেও ঐতিহ্যের দীপ্তি কখনও ম্লান হয় না।