বিধানসভার ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই খোদ লোকসভায় অস্তিত্ব সংকটের মুখে তৃণমূল কংগ্রেস। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনকালে সম্ভবত এটিই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিপর্যয়। সূত্রের খবর, দলের মোট ২৮ জন সাংসদের মধ্যে ১৯ জনই ১৮ মে লোকসভার স্পিকারের কাছে একটি পৃথক সংসদীয় গোষ্ঠী গঠনের আবেদন জানিয়েছেন। বিদ্রোহী এই সাংসদরা নিজেদেরই ‘আসল তৃণমূল’ হিসেবে দাবি করে দলের প্রতীকের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন।
বিদ্রোহী এই ১৯ জনের তালিকায় রয়েছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শতাব্দী রায়, দেব (দীপক অধিকারী), রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, সায়নী ঘোষ, ইউসুফ পাঠান এবং পার্থ ভৌমিকের মতো প্রভাবশালী নেতারা। দলীয় নির্দেশ অমান্য করে এই বিশাল অংশ বেরিয়ে যাওয়ায় মমতা-অভিষেক শিবিরে এখন মাত্র ৯ জন সাংসদ অবশিষ্ট রইলেন। এঁদের মধ্যে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌগত রায়, মহুয়া মৈত্র এবং শত্রুঘ্ন সিনহা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে থাকলেও, দলের অন্দরে ছড়িয়ে পড়েছে চরম অস্থিরতা। গত ১৯ মে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিফ হুইপ নিযুক্ত করা হলেও, বিদ্রোহীরা ১৮ মে-ই তাদের আবেদন জমা দিয়ে রেখেছেন, যা কৌশলগতভাবে মমতা শিবিরকে বড় চাপে ফেলেছে।
বিদ্রোহী শিবির আপাতত বিজেপি বা এনডিএ-তে যোগদানের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিলেও, তাদের লক্ষ্য যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানানো, তা স্পষ্ট। তারা দাবি করেছেন, বাংলার মানুষের স্বার্থে তারা সংসদে স্বাধীনভাবে কাজ করতে চান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতীকের অধিকার কার দখলে থাকবে—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় না কি এই ১৯ বিদ্রোহী সাংসদ—তা নিয়ে খুব শিগগিরই নির্বাচন কমিশন ও সুপ্রিম কোর্টে দীর্ঘ আইনি লড়াই শুরু হতে চলেছে।
এই চরম সংকটময় মুহূর্তে দলের অন্দরে বিদ্রোহের আঁচ আরও বাড়িয়েছেন প্রবীণ সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কার্যপদ্ধতি ও ‘ঔদ্ধত্যের’ বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তিনি। কল্যাণের স্পষ্ট হুঙ্কার, “মমতাদিকে বেছে নিতে হবে, আমি না অভিষেক!” দলের পরিস্থিতি নিয়ে চরম হতাশ কল্যাণ আরও এক ধাপ এগিয়ে অভিষেকের হয়ে কলকাতা হাইকোর্টে বিধায়ক সই জালিয়াতি মামলা লড়বেন না বলেও জানিয়ে দিয়েছেন। দলের বিপর্যয়ের জন্য তিনি সরাসরি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেই দায়ী করে বলেন, “ওর জন্যই দলটা শেষ হয়ে গেল।”
তৃণমূলের এই ডামাডোলে এখন রাজ্য রাজনীতির অন্দরে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে: তবে কি শেষ পর্যন্ত কল্যাণের মতো দলের প্রবীণ ও বিশ্বস্ত নেতারাও এই বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিতে চলেছেন? স্পিকার এই ১৯ জনের আবেদন স্বীকার করে নিলে লোকসভায় তৃণমূলের অস্তিত্ব কার্যত নস্যাৎ হয়ে যেতে পারে। এখন দেখার, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ভাঙন রুখতে শেষ মুহূর্তে কী মাস্টারস্ট্রোক খেলেন।





