মমতার অ্যাকাউন্টে ৩০ লাখ! নেপথ্যে কিসের ‘রয়্যালটি’? ED-র রিপোর্টে চাঞ্চল্য

রাজ্য রাজনীতিতে ফের তোলপাড়। দুর্গাপুজোর পাস বিক্রির কোটি কোটি টাকা তছরুপের অভিযোগে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার জালে প্রাক্তন তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন। কিন্তু তাঁর গ্রেফতারির পর বিতর্ক শুধু এক প্রাক্তন মন্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; শোরগোল ফেলেছে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর বিস্ফোরক দাবি এবং কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ED-র দেওয়া চাঞ্চল্যকর তথ্য।
কী অভিযোগ প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে?
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, ইউনেস্কোর (UNESCO) নাম ভাঙিয়ে দুর্গাপুজোর ‘ডোনার পাস’ বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার আর্থিক দুর্নীতি করা হয়েছে।
সংস্থার ভূমিকা: ইন্দ্রনীল সেন ‘মাস আর্ট’ নামক একটি সংস্থার অন্যতম মূল দায়িত্বে ছিলেন।
পাস বিক্রি: ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে এই সংস্থার মাধ্যমে ১ লক্ষেরও বেশি পাস বিক্রি করা হয়, যার প্রতিটির মূল্য ছিল ১,৭৪৯ টাকা থেকে ৫,৪৯৯ টাকা পর্যন্ত।
কোটি কোটি টাকার লেনদেন: তদন্তে উঠে এসেছে, ইন্দ্রনীল সেনের নিজস্ব প্রোপ্রাইটরশিপ সংস্থা ‘মেসার্স অক্টেভ রেকর্ডস’-এর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা জমা হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, তাঁর পরিবারের সদস্যদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টেও প্রায় ৩০ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের হদিশ পেয়েছেন গোয়েন্দারা।
“একা খাননি, মমতাকে খাইয়ে খেয়েছেন” — শুভেন্দুর মারাত্মক অভিযোগ
ইন্দ্রনীল সেন গ্রেফতার হতেই সুর চড়িয়েছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। নবান্ন থেকে কড়া ভাষায় তোপ দেগে তিনি বলেন:
“মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রত্যক্ষ মদতেই এই দুর্নীতি হয়েছে। ওঁরও নিশ্চয়ই ভাগ ছিল, উনি একা তো খাননি—খাইয়ে খেয়েছেন! মমতা ও ইন্দ্রনীল একে অপরের পরিপূরক ছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক চোরেদের আসল জায়গা জেলেই।”
ইন্দ্রনীল সেনের সঙ্গে মমতার ঘনিষ্ঠতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শুভেন্দু কটাক্ষের সুরে বলেন, “ওঁরা একসঙ্গে গাড়িতে ঘুরে বেড়াতেন, ডুয়েট গান গাইতেন। শেষ গানটাও আমরা শুনেছি— ‘আমার যাওয়ার সময় হল, দাও বিদায়…’।”
ED-র জালে ‘রয়্যালটি’ বিতর্ক: মমতার অ্যাকাউন্টে ৩০ লক্ষ টাকা?
ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেফতারির পর কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)-এর প্রকাশ করা বিবৃতি রাজ রাজনীতিতে আগুনে ঘি ঢেলেছে। ED-র দাবি:
‘অক্টেভ রেকর্ডস’-এর অ্যাকাউন্টে জমা পড়া ৩ কোটি ৮০ লক্ষ টাকার মধ্যে ৩০ লক্ষ টাকা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর (Transfer) করা হয়েছে।
জিজ্ঞাসাবাদে ইন্দ্রনীল সেন দাবি করেছেন, এই অর্থ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘রয়্যালটি’ বাবদ দেওয়া হয়েছিল। তবে কিসের রয়্যালটি বা কিসের ভিত্তিতে এই টাকা দেওয়া হলো, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা ইন্দ্রনীল বা তাঁর সংস্থা দিতে পারেনি।
পাল্টা আক্রমণে অভিষেক: “মেরুদণ্ড না বেচলে জেলে যেতে হয়”
ইন্দ্রনীলের গ্রেফতারি এবং বিরোধী দলনেতার একের পর এক অভিযোগের জবাবে চাঁচাছোলা ভাষায় আক্রমণ শানিয়েছেন তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
তিনি স্পষ্ট জানান, “আজকের ভারতে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে যাঁরা মেরুদণ্ড সোজা করে লড়াই করছেন, তাঁদেরকেই চক্রান্ত করে জেলে পাঠানো হচ্ছে। অন্যদিকে, আসল চোর ও চিটিংবাজরা বিজেপির পতাকা হাতে নিলে তাঁদের সাত খুন মাফ হয়ে যায়। এটাই কি মোদীজির নতুন ভারত?”
উপসংহার:
দুর্গাপুজোর পাসের নামে ওঠা এই বিরাট তছরুপের জল এখন কতদূর গড়ায়, এবং ED-র এই রিপোর্টের পর রাজ্য রাজনীতির সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়—সেদিকেই এখন নজর পুরো রাজ্যের।