ভোরে বিকট শব্দে কাঁপল মাটি! অন্ডালের পরিত্যক্ত খনির আতঙ্ক ফের তুঙ্গে, বড় বিপদের মুখে জনবসতি

নিম্নচাপের অবিরাম বৃষ্টি এবং সক্রিয় মৌসুমি আবহাওয়ার জেরে ফের মারাত্মক ধসের ঘটনা ঘটল পশ্চিম বর্ধমানের অন্ডালে। বুধবার ভোরের আলো ফোটার আগেই, ঠিক সকাল প্রায় পাঁচটা নাগাদ অন্ডাল থানার হরিপুর ৭/৯ কোলিয়ারির মণ্ডলপাড়া এলাকায় হঠাৎই বিকট শব্দে মাটি ধসে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে এই ভয়াবহ ঘটনায় পুরো জনবসতি এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যদিও অল্পের জন্য একটি বড়সড় প্রাণহানি বা দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে, তবে এই ঘটনার জেরে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়ে ফের একশো শতাংশ প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গিয়েছে, ঠিক যে জায়গাতে এই ধস নেমেছে, তার পাশেই রয়েছে ব্রিটিশ আমলের বহু পুরনো একটি পরিত্যক্ত খনি। খনির কাজ অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেলেও তার চারপাশে গড়ে উঠেছে ঘন জনবসতি এবং একের পর এক পাকা বাড়ি। ফলে প্রতিবার বর্ষা এলেই ধসের আশঙ্কায় রাতের ঘুম উড়ে যায় এলাকাবাসীর। স্থানীয় বিজেপি যুব মোর্চার এক নেতার অভিযোগ, এর আগেও এই একই এলাকায় ধস ও অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটেছিল। সেই সময় ইস্টর্ন কোলফিল্ডস লিমিটেড বা ইসিএল কর্তৃপক্ষকে বারবার জানানোর পর কেবল ছাই দিয়ে গর্ত ভরাট করা হয়েছিল, কিন্তু কোনো স্থায়ী ও বৈজ্ঞানিক প্রতিকার করা হয়নি। বারবার সতর্ক করার পরেও যদি এভাবে জনবসতি এলাকায় ধস নামে, তবে ইসিএল কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারে না বলে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন স্থানীয়রা।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দা রাজেশ কুমার সিং আতঙ্কের সুরেই জানান, “আজ যেভাবে হঠাৎ করে মাটি ধসে বসে গেল, সেই নির্দিষ্ট সময়ে যদি কোনো পথচারী বা শিশু ওই এলাকার ওপর দিয়ে যাতায়াত করত, তবে নিশ্চিতভাবে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে যেত।”

যদিও স্থানীয়দের আনা সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দিয়েছে ইসিএল কর্তৃপক্ষ। সংস্থার আধিকারিক তারকেশ্বর সিংহ দাবি করেছেন যে, বর্ষাকালে খনিগর্ভ ও পরিত্যক্ত এলাকায় ধস নামা নতুন কোনো ঘটনা নয়। যে নির্দিষ্ট জায়গায় ধস নেমেছে, সেখানে বহু পুরনো একটি পরিত্যক্ত খনি ছিল যা অতীতে মাটি, ছাই ও বালি দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। উলটো ইসিএলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, এলাকার বেশ কিছু মানুষ নিয়ম লঙ্ঘন করে ওই পরিত্যক্ত খনির ঠিক ওপরে বা পাশেই অবৈধভাবে বসতি গড়ে তুলেছেন এবং নিজেদের জীবন বিপন্ন করছেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে ইসিএলের পক্ষ থেকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের তরফে জানানো হয়েছে, ধস কবলিত অংশটি দ্রুত মাটি ও বালি দিয়ে সুরক্ষিতভাবে ভরাট করা হবে এবং কোনো বিপজ্জনক এলাকায় যাতে সাধারণ মানুষ বা শিশুরা প্রবেশ করতে না পারে, তার জন্য চারপাশ ঘিরে শক্তপোক্ত ব্যারিকেড তৈরি করা হবে।

কিন্তু এই সাময়িক পদক্ষেপে কি আদতে চিরতরে ঘুচবে ধসের আতঙ্ক? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে মণ্ডলপাড়ার প্রতিটি মানুষের মনে। কারণ এই বিপজ্জনক এলাকায় কেবল সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষই নন, খনি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ইসিএলের বহু কর্মী ও তাঁদের পরিবারও ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। বুধবার ভোরের এই হঠাৎ ধস আগামী দিনে কোনো এক মর্মান্তিক বিপদের পূর্বসংকেত কি না, সেই আশঙ্কায় এখন দিন কাটাচ্ছেন অন্ডালের আতঙ্কিত বাসিন্দারা।