ভোররাতেই থমথমে বজবজ! এনআইএ-র জালে ২, নেপথ্যে রহস্যময় টেলিগ্রাম গ্রুপ ‘পূর্ব আকাশ’?

ভোরের আলো তখনও ভালো করে ফোটেনি। সাধারণ মানুষের ঘুম ভাঙার আগেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার বজবজ জুড়ে শুরু হয় চরম চাঞ্চল্য। জামাত-উল-মুজাহিদ্দিন (JMB)-এর মতো নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের নেটওয়ার্ক এবং সন্দেহভাজন মডিউলের খোঁজে মঙ্গলবার ভোররাতে একযোগে অভিযানে নামে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা (NIA)। বজবজ, পূর্ব বর্ধমান ও ডায়মন্ড হারবারসহ রাজ্যের অন্তত পাঁচটি ভিন্ন স্থানে একই সাথে শুরু হয় এই তল্লাশি অভিযান।
এনআইএ সূত্রের খবর, দক্ষিণ ২৪ পরগনার বজবজের মিঠাপুকুর ও বলরামপুর এলাকায় বিশাল বাহিনী নিয়ে হানা দেন তদন্তকারীরা। পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে চালানো হয় তল্লাশি। এই চিরুনি অভিযানে গ্রেফতার করা হয়েছে শেখ জুম্মান হোসেন নামে এক যুবককে। একই সঙ্গে বজবজের চিংড়িপোতার শেখ পাড়া থেকে মহম্মদ সাহারুল পুরকাইত নামের আরও এক ব্যক্তিকে হেফাজতে নিয়েছে কেন্দ্রীয় সংস্থা।
পরিবারের সদস্যদের মোবাইল বাজেয়াপ্ত, ডায়মন্ড হারবারেও হানা
স্থানীয় ও পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার কাকভোরে চিংড়িপোতার শেখপাড়া এলাকায় আচমকাই এসে উপস্থিত হন এনআইএ-র আধিকারিকরা। তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি পরিবারের সমস্ত সদস্যের মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করেন তদন্তকারীরা। স্থানীয় পুলিশকে পাহারায় রেখে এনআইএ-র টিম পৌঁছে যায় ডায়মন্ড হারবারের দিকেও।
ধৃত সাহারুলের স্ত্রী নারগিস বিবি জানান, “সাহারুলের মূল বাড়ি ডায়মন্ড হারবারের রঘুনাথপুরে হলেও গত প্রায় ২০ বছর ধরে সে বজবজে শ্বশুরবাড়িতেই স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে থাকত। ভোর সাড়ে পাঁচটা নাগাদ আধিকারিকরা আসেন এবং সাহারুলকে সাথে নিয়ে তার মূল বাড়ির খোঁজে ডায়মন্ড হারবারে যান।” সূত্রের খবর, সাহারুল এর আগেও পুলিশের জালে ধরা পড়েছিল।
ডিজিটাল জালে ‘পূর্ব আকাশ’: তদন্তের মোড় ঘুরল টেলিগ্রাম গ্রুপে
পেশায় দর্জি শেখ জুম্মানের গ্রেফতারির পর তাঁর পরিবারকে দেওয়া ‘ইন্টিমেশন অফ অ্যারেস্ট’ থেকে উঠে এসেছে বিস্ফোরক সব তথ্য। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) এবং কঠোর বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন (UAPA)-এর একাধিক ধারায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তদন্তকারী নথি অনুযায়ী, এই মামলায় আগে চার্জশিটভুক্ত একাধিক অভিযুক্তের সঙ্গে জুম্মানের সরাসরি যোগাযোগের প্রমাণ মিলেছে। তবে তদন্তে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর মোড় এনেছে একটি তথাকথিত র্যাডিক্যালাইজড টেলিগ্রাম গ্রুপ— ‘পূর্ব আকাশ’। জুম্মান এই গোপন ডিজিটাল গ্রুপের সক্রিয় সদস্য ছিল বলে সন্দেহ তদন্তকারীদের।
অসাম মডিউলের সাথে কি পশ্চিমবঙ্গ যোগ?
তদন্তকারীদের দাবি, এনআইএ-র নজরে এসেছে কীভাবে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ, সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে চরমপন্থী মতাদর্শ ছড়ানোর চেষ্টা করছিল।
সম্প্রতি অসমে উন্মোচিত হওয়া একটি জঙ্গি মডিউলের তদন্তেও এই ‘পূর্ব আকাশ’ নামের টেলিগ্রাম গ্রুপটির সক্রিয় ভূমিকার কথা উঠে এসেছিল। সেই সূত্র ধরেই দেশের অন্যান্য রাজ্যে এই চক্রের কোনো ডালপালা ছড়িয়ে রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছিলেন গোয়েন্দারা। আর সেই সূত্রে অনুসন্ধানে নেমেই কি শেষ পর্যন্ত বজবজের এই গোপন ঘাঁটির হদিস পেল এনআইএ? এই পুরো ডিজিটাল নেটওয়ার্কের শিকড় কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছে, তা জানতে ধৃতদের মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করছেন তদন্তকারীরা।