ভুয়ো বার্থ সার্টিফিকেট চক্রের টুটি টিপতে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত! এবার পঞ্চায়েত ও পুরসভার সব শংসাপত্র থাকবে পুলিশের ডাটাবেসে!

রাজ্যজুড়ে জাল জন্ম ও মৃত্যুর শংসাপত্রের রমরমা এবং অনুপ্রবেশকারীদের রমরমিয়ে সার্টিফিকেট পাওয়ার রুট খতম করতে এবার এক অভূতপূর্ব ও অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপে হাঁটল রাজ্য পুলিশ। সীমান্তবর্তী বিভিন্ন জেলা থেকে লাগাতার একাধিক ভুয়া বা জাল বার্থ সার্টিফিকেটের হদিশ পাওয়ার পরেই নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। এবার থেকে রাজ্যের সমস্ত গ্রাম পঞ্চায়েত এবং মিউনিসিপ্যালিটি অফিসগুলি থেকে ইস্যু করা জন্ম ও মৃত্যুর শংসাপত্রগুলি নিজেদের কাছে সংরক্ষণ বা ব্যাকআপ হিসেবে রাখতে চলেছে রাজ্য পুলিশ। আগামী দিনে এই সংবেদনশীল নথি সংক্রান্ত যে কোনো আইনি তদন্তের প্রয়োজনে পুলিশের এই সংরক্ষিত ডাটাবেসই হবে মূল হাতিয়ার। ইতিমধ্যেই রাজ্যের সমস্ত জেলার পুলিশ সুপার (SP) এবং পুলিশ কমিশনারদের (CP) এই বিষয়ে অত্যন্ত কড়া ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশ পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে পুলিশি সূত্রের খবর।

সূত্রের খবর অনুযায়ী, বিগত কিছু সময় ধরে জন্ম ও মৃত্যুর শংসাপত্র যাচাইয়ের কাজ করতে গিয়ে গোয়েন্দা ও পুলিশ প্রশাসন একাধিক জাল সার্টিফিকেটের খোঁজ পেয়েছিল, যেগুলির বেশিরভাগটাই উদ্ধার হয়েছিল সীমান্তবর্তী জেলাগুলি থেকে। এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড রুখতেই সম্প্রতি রাজ্য সরকার জন্ম ও মৃত্যু শংসাপত্র আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে একাধিক বড় বদল ঘটিয়েছে। যার ফলস্বরূপ, এবার থেকে স্থানীয় বিভিন্ন পৌরসভা ও পঞ্চায়েত অফিসগুলিতে সংরক্ষিত জন্ম ও মৃত্যুর শংসাপত্রের তথ্য এবং কপিগুলি বিভিন্ন জেলার পুলিশের নজরদারিতে নিরাপদে সংরক্ষণ করে রাখা হবে। এই বিশেষ অভিযানের মূল প্রধান দুটি লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে—প্রথমত, অতীতে বিভিন্ন সময়ে যে সমস্ত ভুয়ো বার্থ সার্টিফিকেট বেআইনিভাবে ইস্যু করা হয়েছিল, সেই চক্রের মূল পাণ্ডাদের চিহ্নিত করে দ্রুত গ্রেফতার করা এবং দ্বিতীয়ত, যে সমস্ত সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাদের বা তাদের পরিবারের নামে কোনো ভুয়া বার্থ বা ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়েছিল কি না এবং হয়ে থাকলে নেপথ্যে কারা জড়িত ছিল, তা খুঁজে বের করা। আর এই উদ্দেশ্যেই আজ সকাল ১১টা থেকে রাজ্যজুড়ে একযোগে বিশাল অভিযান শুরু হয়েছে। সমস্ত মিউনিসিপ্যালিটি ও পঞ্চায়েত অফিসগুলিতে গিয়ে জন্ম ও মৃত্যু সনদের রেজিস্ট্রেশনের বৈধতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হচ্ছে।

আজকের এই প্রশাসনিক পদক্ষেপের নেপথ্য কারণ ব্যাখ্যা করে এক জরুরি সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্যের মুখ্যসচিব অত্যন্ত ক্ষোভ ও উদ্বেগের সঙ্গে জানান, “১৯৯৭ সালে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের আমলে আইন সংশোধন করে পঞ্চায়েত প্রধানদের এই স্পর্শকাতর সার্টিফিকেটগুলি ইস্যু করার আইনি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। অথচ এর আগে দীর্ঘকাল ধরে সম্পূর্ণ দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীরাই এই কাজ অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে করতেন। কিন্তু এর ফলে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ সরকারি আঙিনাকেন্দ্রিক না থেকে রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে চলে যায়। আমাদের প্রশাসন যদি কোনো অনৈতিক বা বেআইনি কাজের অভিযোগে বিদেশের মাটিতেও বসে থাকা কোনো আইএএস (IAS) অফিসারকে ট্র্যাক করে দেশে ফিরিয়ে আনতে পারে, তবে এই ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের গাফিলতি বরদাস্ত করা যায় না। বর্তমানে বহু জায়গায় দেখা যাচ্ছে পঞ্চায়েত প্রধানরা ইচ্ছেমতো দফতরেই আসছেন না। বস্তুত, একজন সরকারি অফিসারের কাজের নির্দিষ্ট আইনি দায়বদ্ধতা থাকে, কিন্তু এই সমস্ত নির্বাচিত বা বেসরকারি রাজনৈতিক প্রধানদের সেই প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা থাকে না। একমাত্র আমাদের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যেই এমন অদ্ভুত নিয়ম ছিল যেখানে বেসরকারি ব্যক্তিরা এই ধরনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সার্টিফিকেট ইস্যু করার একচ্ছত্র ক্ষমতা পেতেন। এই বিশৃঙ্খলা আর চলতে দেওয়া যায় না।” মুখ্যসচিবের মতে, আজকের দিনে যেকোনো নাগরিকের ভারতীয় পরিচয় নিশ্চিত করতে, বৈধ আধার কার্ড (Aadhar Card), প্যান কার্ড (PAN Card) কিংবা অন্যান্য জরুরি আইনি নথিপত্র তৈরির ক্ষেত্রে এই বার্থ সার্টিফিকেট বা জন্ম শংসাপত্রটিই সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাথমিক দলিল। তাই এর সুরক্ষায় কোনো অবস্থাতেই সমঝোতা করবে না প্রশাসন।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty