ভিক্টোরিয়ায় পৌঁছাচ্ছে মেট্রোর টিবিএম ‘দিব্যা’! ১০ মাসের অক্লান্ত পরিশ্রমে নতুন মাইলফলক কলকাতার আন্ডারগ্রাউন্ডে

কলকাতা মেট্রো প্রকল্পের অগ্রগতিতে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং রোমাঞ্চকর অধ্যায় যুক্ত হতে চলেছে। শহরের পাতালপথে নতুন সুড়ঙ্গ খননের কাজে ব্যবহৃত নির্দিষ্ট টানেল বোরিং মেশিন (TBM) যার নাম রাখা হয়েছিল ‘দিব্যা’, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল চত্বরে পৌঁছাতে চলেছে। দীর্ঘ ১০ মাসের অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিখুঁত প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনার পর এই সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। এর আগে গত বছরের অক্টোবর মাস থেকে নিজের সুড়ঙ্গ খননের কাজ শুরু করেছিল টিবিএম দিব্যা। পাশাপাশি, এই কাজে ইতিমধ্যেই যুক্ত হয়েছে অপর একটি শক্তিশালী টানেল বোরিং মেশিন ‘দুর্গা’। এই জোড়া টিবিএম ইতিমধ্যে মাটি খুঁড়ে ১৭২৩ মিটার দীর্ঘ পথ সফলভাবে অতিক্রম করে এসেছে, যা কলকাতার পরিকাঠামো উন্নয়নের ইতিহাসে এক বিরাট মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকছে।
মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষ সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, ভিক্টোরিয়া পর্যন্ত প্রথম ধাপের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর এই দুটি বিশালাকার যন্ত্রের এক দফা রক্ষণাবেক্ষণ বা মেইনটেন্যান্স করা হবে। এরপর সেখান থেকে শুরু হবে পার্ক স্ট্রিটের অভিমুখে পরবর্তী ৯১৪ মিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গ খননের কাজ। পুরো টানেলিং প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর পার্ক স্ট্রিট স্টেশন থেকে এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত বাকি শেষ ২০০ মিটার অংশ ‘কাট অ্যান্ড কভার’ (Cut and Cover) পদ্ধতিতে সুড়ঙ্গ নির্মাণ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বর্তমান কাজের গতিপ্রকৃতি বজায় থাকলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ‘দুর্গা’ এবং আগামী ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে ‘দিব্যা’ সফলভাবে পার্ক স্ট্রিটে গিয়ে পৌঁছাবে বলে জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। এই পুরো মেগা প্রজেক্টের কাজ নির্বিঘ্নে পরিচালনা করতে খিদিরপুরের সেন্ট টমাস স্কুলের চত্বরে লম্বায় ৩৭ মিটার, চওড়ায় ২২ মিটার এবং প্রায় ১৭ মিটার গভীর একটি বিশাল চৌবাচ্চার আকৃতির গর্ত খনন করা হয়েছিল, যেখান থেকেই মূলত এই বিশাল যান্ত্রিক অভিযানের সূচনা ঘটেছিল।
উল্লেখ্য, সুড়ঙ্গ খননের এই জটিল প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হয়েছিল প্রায় ৯৫ মিটার লম্বা এবং ৬০০ টন ওজনের এক বিশাল আকৃতির টানেল বোরিং মেশিন। এই যন্ত্রের একদম সামনের মূল কাটিং হেডটিকে ব্যবহার করে অত্যন্ত ধীর ও সতর্ক গতিতে মাটি কাটার কাজ শুরু করা হয়েছিল। এরপর ধাপে ধাপে মাটি কেটে যন্ত্রটি সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পিছনের সুড়ঙ্গ তৈরির সেগমেন্ট বা অংশগুলি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে একে একে যুক্ত করা হয়েছে। তবে গত কয়েক বছর আগে বৌবাজার এলাকায় মেট্রো সুড়ঙ্গ খনন কাজের সময় যে সমস্ত অনভিপ্রেত বিপত্তি ও ভূগর্ভস্থ ধসের ঘটনা ঘটেছিল, তা থেকে কঠোর শিক্ষা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত মেট্রো প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে, কলকাতার সংবেদনশীল নরম মাটির ভূতাত্ত্বিক গঠন এবং সুউচ্চ ভবনগুলির সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে এ যাত্রায় বিশেষ এবং অতিরিক্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
বিশেষ করে সুড়ঙ্গ খনন করার সময় মাটির নিচে যাতে অতিরিক্ত জল না জমে এবং বৌবাজারের মতো কোনো দুর্ঘটনা এড়ানো যায়, তার জন্য জলের সংস্পর্শে আসলে ফুলে যায় এমন বিশেষ রবারের সিল বা ওয়াটারস্টপ ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি, টানেলিংয়ের সুনির্দিষ্ট ও নিরাপদ কাজের স্বার্থে বিশেষ ‘টেল স্ক্রিন গ্রিজ’ (Tail Skin Grease) প্রয়োগ করা হয়েছে, যা মাটির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং সুড়ঙ্গের দেওয়ালকে সুরক্ষিত রাখতে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছে। মেট্রো রেলের এই সুরক্ষিত ও আধুনিক আন্ডারগ্রাউন্ড সম্প্রসারণ কাজ সম্পূর্ণ হলে কলকাতার যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও অনেক বেশি গতিশীল ও আধুনিক হয়ে উঠবে, যা নিয়ে তীব্র কৌতূহল ও উন্মাদনা তৈরি হয়েছে শহরবাসীর মনে।