ভারতে প্রথমবার মিলল ডেঙ্গির প্রথম টিকার অনুমোদন! ড্রাগ কন্ট্রোলের সিলমোহরে কি মিলবে মারণ রোগ থেকে মুক্তি?

বর্ষার মরশুম শুরু হওয়ার আগেই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে শহরে-গ্রামে থাবা বসায় এডিস মশা বাহিত মারণ রোগ ডেঙ্গি। বর্তমান সময়ে শীত বা গ্রীষ্ম—ঋতু পরিবর্তনের তোয়াক্কা না করেই সারা বছর জুড়ে এই রোগের দাপট বজায় থাকে এবং প্রতি বছর বহু মানুষ এই সংক্রমণে প্রাণ হারান। এতদিন পর্যন্ত ডেঙ্গি সংক্রমণ প্রতিরোধ করার সুনির্দিষ্ট কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষেধক বা ঢাল ভারতের বাজারে উপলব্ধ ছিল না। তবে সমস্ত প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবার ভারতে প্রথমবার ডেঙ্গি প্রতিরোধের টিকা হিসেবে বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমোদন মিলল। দেশের শীর্ষ ওষুধ নিয়ামক সংস্থা ড্রাগ কন্ট্রোল জেনারেল অফ ইন্ডিয়া (DCGI) জাপানের নামী ফার্মা সংস্থা টাকেডা বায়োফার্মাসিউটিক্যালস-এর তৈরি জনপ্রিয় ‘কিউডেঙ্গা’ (Qdenga) ভ্যাকসিনের বাণিজ্যিক বিক্রিতে সরকারিভাবে সবুজ সংকেত দিয়েছে।
খবর সূত্রে জানা গিয়েছে, এই জীবনদায়ী ভ্যাকসিনটি ৪ থেকে ৬০ বছর বয়সি যে কোনো সুস্থ ব্যক্তিকে প্রদান করা সম্ভব। এই প্রতিষেধকের সবথেকে উল্লেখযোগ্য দিকটি হলো, ভ্যাকসিন গ্রহণের পূর্বে কোনো ধরনের প্রি-ভ্যাকসিনেশন স্ক্রিনিং বা পূর্বে ডেঙ্গি হয়েছিল কি না তা পরীক্ষা করে দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। প্রস্তুতকারী সংস্থা টাকেডা বায়োফার্মাসিউটিক্যালস-এর দাবি অনুযায়ী, কিউডেঙ্গা ভ্যাকসিনটি ডেঙ্গি ভাইরাসের চারটি আলাদা সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই মানব শরীরে অত্যন্ত শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে সম্পূর্ণ সক্ষম। এই ভ্যাকসিনের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিখুঁতভাবে যাচাই করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ২৮ হাজারেরও বেশি স্বেচ্ছাসেবীর ওপর দীর্ঘমেয়াদী ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানো হয়েছিল। পাশাপাশি, ভারতেও এই ভ্যাকসিনের ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৪৩টি দেশে এই ভ্যাকসিন ব্যবহারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন রয়েছে। এবার ভারত সরকারের এই ঐতিহাসিক অনুমোদনের ফলে দেশের সার্বিক ডেঙ্গি প্রতিরোধ কর্মসূচিতে এটি একটি যুগান্তকারী সংযোজন হতে পারে বলে মনে করছেন চিকিৎসকমহল। তবে সাধারণ নাগরিকদের অবশ্যই চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে এই প্রতিষেধক গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে।
সাধারণত ডেঙ্গিবাহী মশার কামড় খাওয়ার ৪ থেকে ১০ দিনের মধ্যে শরীরে রোগের উপসর্গগুলি প্রকাশ পেতে শুরু করে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই লক্ষণগুলি প্রায় ২ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। ডেঙ্গির প্রাথমিক লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে হঠাৎ করে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত তীব্র উচ্চ জ্বর, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, চোখের পিছনের অংশে ব্যথা, পেশি ও জয়েন্টে মারাত্মক যন্ত্রণা—যাকে অনেক সময় ‘ব্রেকবোন ফিভার’ বা অস্থিভঙ্গ জ্বর বলা হয়ে থাকে। এর পাশাপাশি বমিভাব, খিদে চলে যাওয়া এবং ত্বকে লালচে র্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দেওয়াও অত্যন্ত সাধারণ বিষয়। বেশিরভাগ রোগী সঠিক বিশ্রামে এক সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠলেও, এই সময়ে পর্যাপ্ত তরল পান এবং চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা অত্যন্ত জরুরি।
তবে চিকিৎসকদের মতে, সামান্য অবহেলাতেই পরিস্থিতি গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে। প্রতি ২০ জনে প্রায় ১ জনের ক্ষেত্রে ডেঙ্গি অত্যন্ত বিপজ্জনক রূপ নিতে পারে। সাধারণত জ্বর কমে যাওয়ার ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মারাত্মক লক্ষণগুলি প্রকাশ পায়। এই সময় তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি হওয়া, শ্বাসকষ্ট, নাক বা মাড়ি থেকে রক্তপাত, বমি বা মলে রক্ত বের হওয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা কিংবা ত্বক ঠান্ডা ও ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। বিশেষ দ্রষ্টব্য হিসেবে চিকিৎসকরা বারবার সতর্ক করেছেন যে, ডেঙ্গির উপসর্গ দেখা দিলে নিজে থেকে কোনো ওষুধ খাওয়া সম্পূর্ণ অনুচিত এবং অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন জাতীয় ব্যথার ওষুধ বা আইবুপ্রোফেন সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ এগুলি রক্তপাতের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।