ভারতে নামল মঙ্গল গ্রহ? তামিলনাড়ুর এই লাল মরুভূমি দেখলে রাজস্থানকেও ফিকে মনে হবে!

মরুভূমি মানেই কি দিগন্তবিস্তৃত হলুদ বালুরাশি আর উটের সারি? এই চিরাচরিত ধারণা বদলে দিতে পারে ভারতের এক আশ্চর্য প্রান্ত— ‘থেরি কাডু’। তামিলনাড়ুর তুতিকোরিন জেলায় অবস্থিত এই অঞ্চলটি ভারতের একমাত্র লাল বালির মরুভূমি। তামিল ভাষায় ‘থেরি’ মানে লাল বালির টিলা এবং ‘কাডু’ মানে জঙ্গল বা প্রান্তর। নীল আকাশের নিচে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত এই লাল বালির ঢেউ দেখলে আপনার মনে হবে আপনি পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো গ্রহে, সম্ভবত মঙ্গল গ্রহে পা রেখেছেন!

রাজস্থানের থর মরুভূমি মূলত নদীর পলি আর কোয়ার্টজ বালি দিয়ে তৈরি, তাই তার রং হলুদ। কিন্তু থেরি কাডুর রহস্য লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানে। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, এই বালিতে প্রায় ৬০% আয়রন অক্সাইড বা লোহা মিশে আছে। হাজার হাজার বছর ধরে বঙ্গোপসাগরের নোনা হাওয়া, বৃষ্টি আর কড়া রোদে বালির এই লোহা জারিত (Oxidized) হয়ে মরচে ধরা লোহার মতো টকটকে লাল রং ধারণ করেছে। এর সঙ্গে মিশে আছে গার্নেট, ইলমেনাইট এবং রুটাইলের মতো ভারী খনিজ, যার ফলে রোদে এই বালি হিরের মতো চকচক করে।

এই অপূর্ব প্রাকৃতিক ক্যানভাসকে সেলুলয়েডে বন্দি করেছেন প্রখ্যাত পরিচালকরা। সন্তোষ সিভানের ‘অশোকা’ সিনেমা থেকে শুরু করে মণি রত্নমের ‘রাবণ’— রুপালি পর্দার অনেক অবিস্মরণীয় দৃশ্য শুট করা হয়েছে এই লাল বালির টিলায়। প্রায় ১২,০০০ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই মরুভূমি মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত— কুডানকুলাম, সাত্তানকুলাম এবং ইতামোজি থেরি। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় বালির রং যখন গাঢ় লাল থেকে গোলাপি আভা নেয়, তখন সেই দৃশ্য পর্যটকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে।

কীভাবে যাবেন ও সতর্কতা:
তামিলনাড়ুর তিরুচেন্দুর শহর থেকে মাত্র ১৫ কিমি দূরে এই মরুভূমির অবস্থান। সবচেয়ে কাছের বিমানবন্দর তুতিকোরিন (৫০ কিমি)। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস এখানে ঘোরার সেরা সময়। তবে থেরি কাডু ভ্রমণে কিছু বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি:

প্রচুর জল সাথে রাখুন: জনশূন্য এই মরুভূমিতে কোনো দোকান নেই, তাই অন্তত ২ লিটার জল সাথে রাখা বাধ্যতামূলক।

লোকাল গাইড: টিলার গোলকধাঁধায় রাস্তা হারানো খুব সহজ, তাই স্থানীয় গাইড ছাড়া ভেতরে ঢুকবেন না। মোবাইল নেটওয়ার্ক এখানে অমিল।

পাদুকা: বালির উত্তাপ থেকে বাঁচতে ভালো স্নিকার্স পরুন, খালি পায়ে হাঁটলে চামড়া পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

বিপন্ন এই প্রাকৃতিক সম্পদ:
বর্তমানে এই বিরল মরুভূমিটি অস্তিত্ব সংকটে। একদিকে বেআইনি খনি মাফিয়ারা দামি খনিজ সমৃদ্ধ বালি চুরি করছে, অন্যদিকে কৃত্রিম বনায়নের ফলে লাল টিলাগুলো সবুজে ঢেকে যাচ্ছে। জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া একে ‘ন্যাশনাল জিওলজিক্যাল মনুমেন্ট’ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। ভারতের এই ‘মঙ্গল গ্রহ’ দেখার পরিকল্পনা থাকলে দেরি করবেন না, কারণ অযত্ন আর অবহেলায় হয়তো আগামী কয়েক দশকে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে এই লাল বিস্ময়।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy