মানব কোষের নিউক্লিয়াসে (Cell’s Nucleus) কী প্রবেশ করবে বা কী বেরিয়ে যাবে, সেই প্রক্রিয়াটি কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়— এই রহস্য যুগ যুগ ধরে বিজ্ঞানীদের ধাঁধায় ফেলে রেখেছিল। সম্প্রতি ইসরায়েলি এবং মার্কিন বিজ্ঞানীরা যৌথভাবে সেই জটিল ধাঁধার সমাধান করেছেন, যা ক্যান্সার, অ্যালজাইমার্স এবং এএলএস (ALS)-এর মতো রোগের চিকিৎসায় নতুন আলো ফেলতে পারে। হিব্রু ইউনিভার্সিটি অফ জেরুজালেম এই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের কথা ঘোষণা করেছে।
হিব্রু ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া (UCSF), রকফেলার ইউনিভার্সিটি এবং অ্যালবার্ট আইনস্টাইন কলেজ অফ মেডিসিনের গবেষকরা খুঁজে পেয়েছেন, কোষের এই ক্ষুদ্র গেটওয়েগুলি একটি নমনীয় প্রোটিন নেটওয়ার্ক এবং বিশেষ আণবিক ‘পাসপোর্ট’ ব্যবহার করে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে অণু চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে।
কীভাবে কাজ করে এই ‘নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি চেকপয়েন্ট’?
এই গেটওয়েগুলিকে বলা হয় নিউক্লিয়ার পোর কমপ্লেক্স (NPCs)। প্রতিটি NPC একটি মানুষের চুলের প্রায় পাঁচ-শতাংশেরও কম চওড়া— অর্থাৎ এটি এতটাই ক্ষুদ্র। এই গেটওয়েগুলিই নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরে এবং বাইরে সমস্ত ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণ করে।
এই গবেষণার প্রধান লেখক, হিব্রু ইউনিভার্সিটির ডঃ বারাক রাভেহ ব্যাখ্যা করেছেন, “NPCs হলো অত্যন্ত অত্যাধুনিক নিরাপত্তা চৌকির মতো। এটি প্রতি মিনিটে লক্ষ লক্ষ অণুকে প্রবেশ করতে দেয়, অথচ ভুল অণুগুলিকে বাইরে রাখে— অবিশ্বাস্য নির্ভুলতার সাথে।”
বিজ্ঞানীরা কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে একটি ‘ভার্চুয়াল মাইক্রোস্কোপ’ তৈরি করেছেন, যা সরাসরি দেখা সম্ভব নয় এমন ক্ষুদ্র প্রক্রিয়াকে পর্যবেক্ষণ করতে সাহায্য করেছে। নতুন মডেলে দেখা গেছে, NPC-এর ভিতরে রয়েছে ‘FG রিপিট’ নামক প্রোটিন চেইনগুলির একটি ঘন, সর্বদা চলমান ‘জঙ্গল’। এই ভিড়ের পরিবেশটি ছোট অণুগুলিকে পার হতে দিলেও, এসকর্ট ছাড়া অণুগুলিকে আটকে দেয়।
‘আণবিক পাসপোর্ট’ থাকলেই প্রবেশ
তবে বড় অণুগুলি তখনও প্রবেশ করতে পারে, যদি তারা নিউক্লিয়ার ট্রান্সপোর্ট রিসেপ্টর নামক আণবিক ‘পাসপোর্ট’ বহন করে। রকফেলার ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মাইকেল রাউট বলেন, “এই পরিবহন ব্যবস্থাটি একটি সেতুর উপর ক্রমাগত স্থানান্তরিত নাচের মতো কাজ করে। যাদের কাছে সঠিক অংশীদার— অর্থাৎ রিসেপ্টর— আছে, কেবল তারাই পার হতে পারে।”
এই আবিষ্কার কোষের আণবিক ট্র্যাফিকের নিয়ন্ত্রণের প্রথম স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছে এবং এটি রোগ বোঝার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। বিজ্ঞানীরা এখন এই জ্ঞান ব্যবহার করে এমন ওষুধ তৈরি করতে পারেন, যা কোষের নিউক্লিয়াসে সরাসরি প্রবেশ করে চিকিৎসাকে আরও কার্যকর করবে।