পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বিপুল জয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই উত্তপ্ত হয়ে উঠল ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক। বাংলায় ক্ষমতার পালাবদলের পরেই ঢাকা থেকে ‘পুশব্যাক’ বা অনুপ্রবেশকারীদের জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এর জবাবে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক (MEA) স্পষ্ট জানিয়ে দিল— কোনো জল্পনা নয়, বরং আইন মেনেই বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের ফেরানোর প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের সহযোগিতা প্রয়োজন।
ঢাকার আশঙ্কা ও হুঁশিয়ারি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হতেই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী খলিলুর রহমান সম্প্রতি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতিতে সীমান্ত দিয়ে জোর করে মানুষ পাঠানোর (Pushback) চেষ্টা হতে পারে। তাঁর হুঙ্কার, “যদি এমন কোনো ঘটনা ঘটে, তবে বাংলাদেশ চুপ করে থাকবে না এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে।” বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবি-কেও (BGB) হাই-অ্যালার্টে রাখা হয়েছে।
দিল্লির মোক্ষম জবাব: ‘আগে নিজেদের নথিপত্র দেখুন’ বাংলাদেশের এই ‘পুশব্যাক’ আতঙ্কের প্রেক্ষিতে মুখ খুলেছেন ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। বৃহস্পতিবার এক সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, কোনো উস্কানিমূলক মন্তব্য নয়, বরং মূল সমস্যা সমাধানে ঢাকার সদিচ্ছা প্রয়োজন। ভারতের পক্ষ থেকে কয়েকটি চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরা হয়েছে:
আটকে রয়েছে ২৮৬২টি মামলা: ভারতের দাবি, ২৮৬২ জন বেআইনি নাগরিকের জাতীয়তা যাচাইয়ের (Nationality Verification) আবেদন বাংলাদেশের কাছে পড়ে রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এই নথি যাচাইয়ের কাজ গত ৫ বছর ধরে আটকে রাখা হয়েছে।
আইনগত সহযোগিতা: ভারত জানিয়েছে, কোনো বেআইনি বিদেশি নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠানো একটি প্রতিষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়ার অংশ। কিন্তু বাংলাদেশ যদি তাদের নাগরিকদের শনাক্ত করতে দেরি করে, তবে সেই প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
বিজেপির জয় ও প্রেক্ষাপট: বিদেশ মন্ত্রকের মতে, বাংলায় বিজেপির জয়কে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের যে প্রতিক্রিয়া, তা আসলে অনুপ্রবেশ সমস্যার মূল জায়গা থেকে নজর ঘোরানোর চেষ্টা।
আসাম ও বাংলার সীমান্ত পরিস্থিতি সম্প্রতি আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ২০ জন অনুপ্রবেশকারীকে পুশব্যাক করার কথা ঘোষণা করতেই উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছিল। এবার বঙ্গ জয়ের পর বিজেপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী অনুপ্রবেশ ইস্যুতে যে আরও কড়া পদক্ষেপ নেবে, তা আঁচ করেই বিচলিত ঢাকা।
কূটনৈতিক টানাপোড়েন বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনা পরবর্তী বাংলাদেশে মুহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন এবং তারেক রহমানের যে রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক এখন অ্যাসিড টেস্টের মুখে। তিস্তা জলবণ্টন থেকে শুরু করে অনুপ্রবেশ— প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভারত এখন অনেক বেশি সরাসরি এবং কড়া ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছে।
ঢাকার এই ‘হুঁশিয়ারি’ আর দিল্লির ‘চরমপত্র’— দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের সমীকরণ আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার।





