‘বিলাসবহুল মামলা’ বরদাস্ত করা হবে না! আইনজীবীর সঙ্গে ১১ বছরের আইনি টানাপোড়েনে চরম বিরক্ত শীর্ষ আদালত

ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটানো কিংবা নিজেদের ভাবমূর্তি বা ইমেজ বাঁচানোর আইনি লড়াইয়ের নামে আদালতের মূল্যবান সময় নষ্ট করা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। প্রবীণ আইনজীবী ও তাঁর প্রাক্তন মক্কেলের মধ্যে প্রায় এক যুগ ধরে চলা দীর্ঘ আইনি টানাপোড়েনে গভীর বিরক্তি প্রকাশ করে এই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এই ধরনের তথাকথিত ‘বিলাসবহুল মামলা’ বা লাক্সারি লিটিগেশন আসল ও অসহায় বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত বিচার পাওয়ার অধিকারকে মারাত্মকভাবে পিছিয়ে দেয়—এই কড়া পর্যবেক্ষণ সামনে রেখে মামলার দুই পক্ষকেই ৫ লক্ষ টাকা করে মোট ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা করার নির্দেশ দিয়েছে বিচারপতি বিক্রম নাথ এবং বিচারপতি সন্দীপ মেহতার ডিভিশন বেঞ্চ।

এই মামলার সূত্রপাত হয়েছিল আজ থেকে প্রায় তেরো বছর আগে, অর্থাৎ ২০১৩ সালে। সেই সময় এক মহিলা তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে পারিবারিক বিবাদের জেরে মালাড পুলিশ স্টেশনে গিয়ে এক শীর্ষ পুলিশ কর্তার সংস্পর্শে আসেন। অভিযোগ ওঠে, ওই পুলিশ কর্তা সাহায্যের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে তাঁর ওপর শারীরিক নির্যাতন ও যৌন হেনস্থার চেষ্টা করেছিলেন। এই গুরুতর ঘটনায় আইনি সহায়তা পাওয়ার আশায় ওই মহিলা জনৈক প্রবীণ আইনজীবীর শরণাপন্ন হন এবং তাঁর হাতে সমস্ত গোপন তথ্য ও সংবেদনশীল প্রমাণপত্র তুলে দেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ওই মহিলার মূল অভিযোগ ছিল, ওই আইনজীবী নিজের পেশাগত মর্যাদা ও গোপনীয়তার আইন সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে তাঁর কোনোরকম সম্মতি ছাড়াই সমস্ত তথ্য সংবাদমাধ্যমে ফাঁস করে দেন এবং আইনি নোটিস জারি করেন।

বিষয়টি জল গড়ায় ‘বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া’ (BCI)-এর অন্দরে। সেখানে ওই আইনজীবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হলে বার কাউন্সিলের ডিসিপ্লিনারি কমিটি তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং তাঁর পেশাদারি লাইসেন্স দু’বছরের জন্য স্থগিত করার নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে অভিযোগকারিণী মহিলাকে ৩ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং বার কাউন্সিলকে আরও ২ লক্ষ টাকা প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে বার কাউন্সিলের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দুই পক্ষই প্রথমে বম্বে হাইকোর্টের দ্বারস্টে যায় এবং সেখান থেকে মামলা গড়ায় দেশের সর্বোচ্চ আদালতে।

দীর্ঘ ১১ বছর ধরে চলা এই মামলার পুঙ্খানুপুঙ্খ শুনানিতে দুই পক্ষকেই চরম ভর্ৎসনা করে সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতিরা সাফ ভাষায় জানিয়ে দেন যে, দেশের বিচার ব্যবস্থা কারও ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটানো কিংবা নিজেদের তৈরি করা বিতর্কের সুযোগ নেওয়ার খেলার মাঠ নয়। দুই পক্ষই আদালতে নিজেদের স্বার্থে মূল তথ্যগুলি গোপন করে হাজির হয়েছিল। বার কাউন্সিল, হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের বিগত এগারোটি বছর ধরে যে বিপুল সময় নষ্ট করা হয়েছে, সেই মূল্যবান সময়টুকু আসলে অন্য কোনো প্রকৃত ও জরুরি বিচারপ্রার্থীর প্রাপ্য ছিল। এরপরই আদালতের সময় নষ্টের অপরাধে দুই পক্ষকে কড়া বার্তা দিয়ে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে ‘সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল সার্ভিসেস কমিটি’-তে ৫ লক্ষ টাকা করে জরিমানা জমা দেওয়ার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ।