বিধানসভা নির্বাচনের ভরাডুবির রেশ কাটতে না কাটতেই তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে যে ফাটল দেখা দিয়েছিল, তা আজ যেন চরম আকার ধারণ করেছে। একদিকে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি তীব্র অনাস্থা, আর অন্যদিকে একের পর এক নেতার দলত্যাগের হিড়িক—সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদলের ভিত এখন নড়বড়ে। বুধবার বিধানসভায় যে ছবি উঠে এসেছে, তা বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব নজির তৈরি করল।
তৃণমূলের অন্দরের এই বিদ্রোহের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সাবিনা ইয়াসমিনের মতো নেতারা। সূত্রের খবর অনুযায়ী, আজ বিধানসভায় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় পৌঁছেছেন ৫৯ জন বিধায়কের সই সম্বলিত চিঠি নিয়ে। এই চিঠিই ঠিক করে দিতে পারে তৃণমূলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। শুধু ঋতব্রতই নন, বিধানসভায় একে একে হাজির হচ্ছেন শিউলি সাহা, অরূপ রায়, আখুজ্জামানের মতো হেভিওয়েট বিধায়করা। তাঁদের সবার লক্ষ্য—বিরোধী দলনেতা কে হবেন, তা দলীয় হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় না থেকে বিধায়কদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা।
মঙ্গলবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধর্না কর্মসূচিতে ঋতব্রতর অনুপস্থিতি এবং বিধানসভায় তাঁর উপস্থিতি ইতিমধ্যেই হাজারো জল্পনার জন্ম দিয়েছিল। যদিও তিনি দাবি করেছিলেন যে ব্যক্তিগত কাজে গিয়েছিলেন, কিন্তু আজকের ঘটনা প্রমাণ করছে যে সেই দাবির আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক বড়সড় রাজনৈতিক ব্লু-প্রিন্ট। আজ সাবিনা ইয়াসমিনকে যখন প্রশ্ন করা হয় কে এই বৈঠকের ডাক দিয়েছে, তিনি সরাসরি বলেন, “আমরা সবাই মিলে।” এই কথা থেকেই স্পষ্ট যে দলের অন্দরে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়ন্ত্রণ এখন কেবল নামমাত্র।
বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে কার নামে সিলমোহর পড়বে, তা নিয়ে স্পিকার রথীন্দ্র বসুও এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাননি। সই-জালিয়াতির অভিযোগে বিদ্ধ তৃণমূলের পরিষদীয় দল এখন কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৈরি এই রাজনৈতিক সাম্রাজ্য আজ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার মুখে। যে বিধায়করা এক সময় দলের অনুগত সৈনিক ছিলেন, তাঁরা আজ খোলাখুলি বিদ্রোহ ঘোষণা করে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে কার্যত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন।
আজকের এই বৈঠক থেকে যদি বিধায়করা নতুন কোনো বিরোধী দলনেতার নাম প্রস্তাব করেন, তবে তা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক বিরাট পটপরিবর্তন নিয়ে আসবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অজেয় ভাবমূর্তি যে এখন চূড়ান্ত সংকটের মুখে, তা আজ বিধানসভার করিডোর থেকেই পরিষ্কার। তৃণমূল কি পারবে তাদের সংসদীয় দলের ঐক্য বজায় রাখতে? নাকি ভেঙে যাবে মমতার লড়াইয়ের ফসল? উত্তর মিলবে খুব শীঘ্রই, তবে আজকের দিনটি যে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসের পাতায় এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে লেখা থাকবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।





