বিপর্যয়ের মধ্যে সুযোগ! হরমুজ সংকটে কোটি কোটি ডলার মুনাফা কোন কোন দেশের?

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইরান কর্তৃক স্ট্রেইট অফ হরমুজ বা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ এবং প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল ও গ্যাস এই জলপথ দিয়েই বিশ্ববাজারে পৌঁছায়। এই গুরুত্বপূর্ণ পথটি বন্ধ হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু অনেক দেশের জন্য এই পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে ‘বিপদে সম্পদ’।
সবচেয়ে বড় লাভবান দেশ হিসেবে উঠে এসেছে রাশিয়া। গত মে মাসে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩২.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৬৭৮.৯ বিলিয়ন রুবেলে (৯.৩ বিলিয়ন ডলার) পৌঁছেছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির আন্তর্জাতিক দাম বৃদ্ধি এবং হরমুজ সংকটের ফলে পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ান তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে রাশিয়া আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের জ্বালানি তেল চড়া দামে বিক্রি করে বিপুল মুনাফা অর্জন করেছে।
হরমুজ সংকটের সরাসরি সুবিধা পেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (EIA) তথ্য অনুযায়ী, সংকটের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের অভাব দেখা দেয় এবং ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৫৮ ডলার থেকে বেড়ে ৭৯ ডলারে উন্নীত হয়। এর ফলে আমেরিকার নিজস্ব তেল উৎপাদন কোম্পানিগুলো তাদের মুনাফা বহুগুণ বাড়িয়ে নিয়েছে এবং ২০২৬ সালে দেশটির প্রতিদিন ১.৩৬ কোটি ব্যারেল তেল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সৌদি আরব এই সংকটে নিজেদের কৌশলী অবস্থান প্রমাণ করেছে। তারা তাদের কৌশলগত ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালীর পরিবর্তে লোহিত সাগর বা রেড সি দিয়ে তেল রপ্তানি অব্যাহত রেখেছে। ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে তাদের এই রপ্তানি বৃদ্ধির ফলে আরামকোর প্রথম প্রান্তিকের নিট মুনাফা গত বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩৩.৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, দীর্ঘস্থায়ী সংকট এড়াতে ইরাক তাদের দীর্ঘ ৬০০ মাইলের পুরনো পাইপলাইন পুনরায় চালু করেছে, যা তুরস্কের সাথে যুক্ত। প্রতিদিন ১৬ লাখ ব্যারেল সক্ষমতার এই পাইপলাইনটি এখন জ্বালানি সরবরাহের প্রধান বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওমান ভৌগোলিকভাবে হরমুজ প্রণালীর বাইরে অবস্থিত হওয়ায় তাদের রপ্তানিতে প্রভাব পড়েনি, বরং তেলের চড়া দামে তাদের রাজস্ব আয় বহুগুণ বেড়েছে। একইসাথে ইউরোপের অন্যতম প্রধান জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ নরওয়েও এই সংকটের সুযোগে বিশ্ববাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য থেকে রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা ঘরে তুলেছে।
এই সামগ্রিক পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, ভূ-রাজনীতির খেলায় হরমুজ প্রণালী বন্ধের মতো একটি সংকট একদিকে যেমন বিশ্বের অনেক দেশের জন্য অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে, অন্যদিকে কিছু প্রভাবশালী দেশ তাদের নিজস্ব অবকাঠামো ও কৌশল ব্যবহার করে এই অস্থিরতাকে নিজেদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে।