আজ ১২ জানুয়ারি, জাতীয় যুব দিবস। স্বামী বিবেকানন্দের ১৬৩তম জন্মজয়ন্তীতে সারা ভারত যখন তাঁকে স্মরণ করছে, তখন ফিরে তাকাতেই হয় ১৮৯৩ সালের সেই ঐতিহাসিক শিকাগো সফরের দিকে। তখন ছিল না সোশ্যাল মিডিয়া, ছিল না কোনো প্রচারের আড়ম্বর— তবুও কীভাবে সাত সমুদ্র তেরো নদী পার করে এক বাঙালি সন্ন্যাসী হয়ে উঠলেন হিন্দু ধর্মের বিশ্বজনীন মুখ?
খেতড়ির রাজার সেই ফার্স্ট ক্লাস টিকিট বিবেকানন্দের শিকাগো যাত্রা সহজ ছিল না। ব্রিটিশ শাসিত ভারত থেকে এক গেরুয়াধারী সন্ন্যাসী আমেরিকা যাবেন, তা মেনে নিতে পারেনি অনেকেই। ঐতিহাসিকরা বলেন, সেই সময় স্বামীজিকে আর্থিক সাহায্য করেছিলেন রাজস্থানের খেতড়ির রাজা অজিত সিংহ। তিনি বিবেকানন্দের জন্য ‘ওরিয়েন্ট’ জাহাজে ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কেটে দিয়েছিলেন। কিন্তু বিদেশের মাটিতে পা রাখার পর শুরু হয় আসল লড়াই।
অপমান ও বর্ণবিদ্বেষের পাহাড় আমেরিকায় পৌঁছে স্বামীজিকে চরম বর্ণবিদ্বেষের মুখে পড়তে হয়েছিল। ‘পিছিয়ে পড়া দেশ’ ও ‘কালো চামড়া’র প্রতিনিধি হিসেবে শুনতে হয়েছে নানা কটূ কথা। এমনকি থাকার জায়গা জোগাড় করতেও হিমশিম খেতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু শিকাগোর বিশ্ব ধর্ম সম্মেলনের মঞ্চে ওঠার জেদ ছিল অটুট।
মাত্র ৩ মিনিটের সেই কালজয়ী ‘ম্যাজিক’ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন হেনরি রাইটের হস্তক্ষেপে সম্মেলনের মঞ্চে বলার সুযোগ পান বিবেকানন্দ। তাঁকে সময় দেওয়া হয়েছিল মাত্র ৩ মিনিট। কিন্তু ‘আমেরিকার ভাই ও বোনেরা…’ (Sisters and Brothers of America) বলে বক্তৃতা শুরু করতেই বদলে যায় ইতিহাস। যে মানুষটিকে কেউ চিনত না, ৩ মিনিট পর সেই সভাগৃহের কয়েক হাজার মানুষ তাঁর সম্মানে দাঁড়িয়ে করতালি দেন।
অতীত বনাম বর্তমান: হিন্দুত্বের সংজ্ঞা আজকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্বামীজির বার্তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বর্তমানের ‘হিন্দুত্ব’ আর বিবেকানন্দের ‘হিন্দু ধর্ম’-এর মধ্যে ফারাক ছিল সহিষ্ণুতায়। স্বামীজি শিখিয়েছিলেন গ্রহণ করতে, ঘৃণা করতে নয়। আধুনিক সংবাদপত্রের মাধ্যমে তাঁর সেই সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বজুড়ে।
উপসংহার: বিবেকানন্দের হিন্দুত্ব ছিল সহিষ্ণুতার, যা বর্তমানের হানাহানির যুগে সবথেকে বড় ওষুধ। ৩ মিনিটের সেই বক্তৃতা আজও ১৩২ বছর ধরে বিশ্বের বুকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।