বার্ধক্যের কান্ডারী দিদা, দুই নাতনির জন্য পূর্ণিমাদেবীর অসম লড়াই বনগাঁর বুকে

উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁর শক্তিগড় নবোদয় ক্লাব এলাকার এক ভগ্নপ্রায় কুঁড়েঘরে চলছে এক হৃদয়বিদারক লড়াই। একদিকে বার্ধক্যের ভার, অন্যদিকে দুই নাবালিকা নাতনির ভবিষ্যৎ। পূর্ণিমা গোস্বামী নামের এক দিদা, যিনি প্রায় ৭০ ছুঁই ছুঁই, একাই যেন এই দুই নাতনির অভিভাবক, মা এবং বাবা – সবকিছু। ১২ বছরের মনীষা অধিকারী ও ১০ বছরের মনিকা অধিকারীর জীবনযুদ্ধ শুরু হয়েছে তাঁদের দিদার ছায়ায়।
পূর্ণিমাদেবীর জীবনে একসময় যৌথ পরিবারের সুখ ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিবার হয়েছে ছিন্নভিন্ন। তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে একজন মানসিক ভারসাম্যহীন, আর অন্য ছেলে বিয়ে করে আলাদা থাকেন। অন্যদিকে, মেয়ে দুটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেওয়ার পর তাদের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করে। দেড় বছর বয়সী মনীষা এবং মাত্র দু’মাসের মনিকাকে দিদার কাছে রেখেই চলে যায় তারা। সেই থেকেই পূর্ণিমাদেবী এই দুই শিশুকন্যার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।
অভাবের সংসার। আশপাশের কয়েকটি বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করে যে সামান্য উপার্জন হয়, তার একটা বড় অংশ চলে যায় ঘরভাড়ায়। বাকি টাকায় চলে খাওয়া-পরা আর পড়াশোনা। মনীষা স্থানীয় বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে আর মনিকা চতুর্থ শ্রেণিতে। অনেক দিনই তাদের খালি পেটে স্কুলে যেতে হয়। মিড ডে মিলই তখন তাদের একমাত্র ভরসা।
পূর্ণিমাদেবী অসুস্থ হলে বা কাজে যেতে না পারলে, এই দুই খুদে বোনই চাল-ডাল জোগাড় করতে বেরিয়ে পড়ে। লাজুক প্রকৃতির এই দুই বোনের করুণ অবস্থা সম্প্রতি সমাজ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এরপরই এলাকার জনপ্রতিনিধি এবং কিছু সমাজসচেতন মানুষ তাদের পাশে এসে দাঁড়ান। স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সহায়তায় তারা রেশনের সুবিধা পেয়েছেন এবং দীর্ঘ অপেক্ষার পর তাদের ভাড়া ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগও এসেছে। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দুই নাতনির পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছে এবং স্কুলের পক্ষ থেকে তাদের সাইকেলও দেওয়া হয়েছে।
তবে পূর্ণিমাদেবীর শরীর এখন আর আগের মতো সায় দেয় না। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা নিয়েই তাঁকে প্রতিদিনের এই কঠিন লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে। সরকারি সাহায্যের তেমন কোনো সুযোগ না মেলায়, তিনি আবেদন জানিয়েছেন, যদি কোনো সহৃদয় ব্যক্তি তাদের পাশে দাঁড়ান, তাহলে নাতনিদের একটু ভালো ভাবে মানুষ করতে পারতেন। নাগরিক সমাজ মনে করছে, দিদা ও নাতনিদের এই অসম লড়াই বর্তমান সমাজকে এক বড় বার্তা দিচ্ছে। তাঁদের এই অদম্য স্পৃহা এবং ভালোবাসা অনেকের চোখেই জল আনছে, যা হয়তো মানবতাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে।