বাদল অধিবেশনের শুরুতেই উত্তপ্ত লোকসভা, পহেলগাঁও ইস্যুতে উত্তাল বিরোধীরা!

সংসদের বাদল অধিবেশনের প্রথম দিনেই লোকসভার মেজাজ ছিল টি-২০ ম্যাচের মতো আক্রমণাত্মক। অধিবেশন শুরু হতেই বিরোধীরা পহেলগাঁও হত্যাকাণ্ড নিয়ে আলোচনার দাবিতে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে, যার জেরে মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যেই দুপুর ১২টা পর্যন্ত সভা মুলতুবি করতে বাধ্য হন স্পিকার ওম বিড়লা।
‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ ধ্বনিতে নিম্নকক্ষ সরব হয়ে ওঠে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে নীরবতা পালনের ঠিক পরেই। বিরোধী সাংসদদের মূল দাবি ছিল, ‘অপারেশন সিঁদুর’ এবং তাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথিত মধ্যস্থতা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সংসদে বিবৃতি দিতে হবে।
কংগ্রেস সাংসদ কেসি বেণুগোপাল সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী ‘অপারেশন সিঁদুর’ নিয়ে বিজয় উৎসব পালনের কথা বলছেন। আমাদের দাবি, এ নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হোক। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। আমরা আমাদের দেশ নিয়ে গর্ব করি, তবে প্রধানমন্ত্রীকে এগিয়ে এসে বিবৃতি দিতেই হবে।”
জবাবে স্পিকার ওম বিড়লা সভা সদস্যদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “প্রতিটি ইস্যুতে সরকার জবাব দেবে। কিন্তু, আপনারা এভাবে হইচই করে স্লোগান দিতে পারেন না। বিধি অনুসারে সব ইস্যুই উঠবে এবং আলোচনাও হবে।” তবে কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী দল নিরস্ত না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত স্পিকারকে সভা মুলতুবি ঘোষণা করতে হয়।
প্রধানমন্ত্রীর ‘বিজয় উৎসব’ ও বিরোধীদের প্রশ্ন:
এদিন সকালে বাদল অধিবেশনের আগে সাংবাদিকদের সামনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সাফল্যের খতিয়ান দেন। তিনি দাবি করেন, “মাত্র ২২ মিনিটে জঙ্গিদের পান্ডাদের বাড়ি ও ঘাঁটি উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন সিঁদুরে’।” তিনি এই বাদল অধিবেশনকে “বিজয় উৎসবের অধিবেশন” আখ্যা দিয়ে বলেন, “গোটা পৃথিবী দেখেছে ভারতের সামরিক শক্তির ক্ষমতা। ‘অপারেশন সিঁদুরে’ আমাদের সেনাবাহিনী যে টার্গেট নিয়েছিল, তা ১০০ শতাংশ সফল হয়েছে।”
পহেলগাঁওয়ের নৃশংস গণহত্যার প্রসঙ্গে মোদি বলেন, “গোটা বিশ্ব কেঁপে উঠেছে। দলগত স্বার্থ ঊর্ধ্বে তুলে রেখে জাতীয় স্বার্থে সব দলগুলো দেশের হয়ে বিশ্বের দরবারে আওয়াজ তুলেছে। তাঁরা সকলে মিলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সফল প্রচার করে এসেছেন।” এই কাজে সাহায্য করার জন্য তিনি সকল সাংসদ ও দলগুলিকে ধন্যবাদ জানান। তাঁর মতে, “গোটা বিশ্বের কাছে এখন পাক মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদ স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। বন্দুক ও বোমার বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছে আমাদের সংবিধান।”
‘অমৃত কাল’-এর জয়গান:
প্রধানমন্ত্রী কেবল ‘অপারেশন সিঁদুর’ নিয়েই থামেননি। তিনি এই অধিবেশন এমন এক সময়ে হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন, যখন ভারতের ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে উড়িয়ে আসা হয়েছে, যা সমগ্র ভারতবাসীর কাছে গর্বের বিষয়। তিনি দাবি করেন, ২০১৪ সালে দেশবাসী তাঁদের উপর যে দায়িত্ব তুলে দিয়েছিল, তা তাঁরা পালন করেছেন এবং দেশ দ্রুত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির পথে এগিয়ে চলেছে। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের নাম না করে মোদি বলেন, “১৪ সালের আগে আমরা ছিলাম ১০ নম্বরে। আজ আমরা তৃতীয় স্থান দখলের জন্য দ্রুত এগচ্ছি।”
তিনি কংগ্রেস আমলের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “২০১৪ সালের আগে এমন একটা সময় ছিল যখন মুদ্রাস্ফীতির হার দুই অঙ্কে পৌঁছেছিল। আর আজ মুদ্রাস্ফীতির হার নেমে প্রায় ২ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে সাধারণ মানুষের উপর খরচে বোঝা অনেক লাঘব হয়েছে। দেশের ২৫ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার বাইরে বেরিয়ে এসেছেন, যা বিশ্বের সকলের কাছে প্রশংসা কুড়িয়েছে।”
সব মিলিয়ে, বাদল অধিবেশনের প্রথম দিনেই সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে এক উচ্চ-ভোল্টেজ সংঘাতের ইঙ্গিত পাওয়া গেল, যা আগামী দিনগুলোতে সংসদের কার্যপ্রণালীকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।