‘বাঙালিরা ব্যবসাবিরোধী’ তকমা ঘুচবে কবে?-বাংলার অর্থনীতি নিয়ে বড় বার্তা অর্থমন্ত্রীর

কলকাতাকে কি তবে ধীরে ধীরে এক প্রবীণ ও অবসরপ্রাপ্ত মানুষের শহর হিসেবেই মনে করা হচ্ছে? বর্তমান প্রজন্মের একটা বড় অংশ কাজের খোঁজে কেন বেঙ্গালুরু, গুরুগ্রাম কিংবা নয়ডার মতো শহরে পাড়ি জমাচ্ছে? সম্প্রতি ‘বিজ়নেস টুডে’-র ‘ইন্ডিয়া@১০০’ মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলার অর্থনীতি নিয়ে এমনই বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক তথা অর্থনীতিবিদ স্বপন দাশগুপ্ত। তাঁর এই বিশ্লেষণ ঘিরে এখন রাজ্য রাজনীতি ও শিল্প মহলে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা।
অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে স্বপন দাশগুপ্ত সরাসরি আঙুল তুলেছেন লাগাতার ব্রেন ড্রেন বা প্রতিভার বহির্গমনের দিকে। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, গত কয়েক দশক ধরে এ রাজ্যের অর্থনৈতিক অবনতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে পশ্চিমবঙ্গ এখন রীতিমতো স্কিল ডেফিসিট বা দক্ষ কর্মীর ঘাটতিতে ভুগছে। দক্ষিণ কলকাতায় নিজের প্রচারের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, এমন বহু পরিবারের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে যাঁদের ছেলেমেয়েরা আর রাজ্যে নেই। কেউ বেঙ্গালুরুতে কর্মরত, তো কেউ গুরুগ্রাম, নয়ডা বা একেবারে সুদূর বিদেশে নিজেদের কেরিয়ার গড়ছেন। বাংলার এই মেধাবী তরুণরা দেশের ও বিদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছেন, কিন্তু তাঁদের সেই মেধা এবং প্রতিভা প্রত্যক্ষভাবে বাংলার অর্থনীতি বা উন্নয়নের কাজে লাগছে না। অন্য রাজ্য বা দেশের বুকেই তাঁদের মেধার সদ্ব্যবহার হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মকে এই রাজ্যে ধরে রাখতে না পারলে যে পরিষেবা ক্ষেত্র, নতুন প্রযুক্তি এবং শিল্প ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে, সে কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি।
রাজ্যের এই বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার জন্য স্বপন দাশগুপ্ত গত প্রায় পাঁচ দশকের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। ষাটের দশকের লাগাতার শ্রমিক অসন্তোষ এবং পরবর্তী বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনের জেরে এককালের শিল্পসমৃদ্ধ বাংলার শিল্পভিত্তি যে দারুণভাবে ধাক্কা খেয়েছিল, সে কথা তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে। পরবর্তী সময়ে সিঙ্গুরে টাটা গোষ্ঠীর কারখানা বাতিল হওয়ার ঘটনাকেও তিনি বাংলার শিল্প মানচিত্রে একটি বড় ভুল বার্তা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, টাটা গোষ্ঠীর মতো দেশের অন্যতম বৃহত্তম শিল্প সংস্থাও যদি এই রাজ্যে ব্যবসা করতে না পেরে ফিরে যায়, তবে তা অন্য বহুজাতিক ও দেশীয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও এক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তবে কেবল অতীতে দোষ চাপিয়েই বসে থাকতে নারাজ এই অর্থনীতিবিদ। তাঁর মতে, বাংলার অর্থনীতিকে সঠিক পথে ফেরাতে হলে সবার আগে মানসিকতার পরিবর্তন আনা জরুরি। দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে বাঙালিদের মধ্যে নাকি ব্যবসাবিরোধী মনোভাব কাজ করে। এই ভুল ভাবমূর্তি এবং সামাজিক মনস্তত্ত্ব বদলানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে তিনি এও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে স্বাধীনতার ঠিক অব্যবহিত পরের সেই পুরনো শিল্প ঐতিহ্য বা সোনালী দিন রাতারাতি বা হুবহু ফিরিয়ে আনা আর সম্ভব নয়। মুর্শিদাবাদ বা অন্যান্য অঞ্চলের সেই ঐতিহাসিক বাণিজ্যকেন্দ্রের গৌরবকে বর্তমানের আধুনিক কাঠামোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
তাহলে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার আসল পথ কী? স্বপন দাশগুপ্তের মতে, অতীতকে আঁকড়ে না থেকে বর্তমানের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন শিল্প, পরিষেবা ক্ষেত্র এবং বিশেষ করে ডিপ টেকনোলজির ওপর ভর করেই বাংলার অর্থনীতিকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। গুজরাত, কর্নাটক বা ওড়িশার মতো রাজ্যগুলি যে গতিতে এগিয়ে চলেছে, তার তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ যে বেশ কিছু ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে, তা স্বীকার করে নিতে হবে। সেই হারানো জায়গা বা জৌলুস পুনরুদ্ধার করতে বেশ কিছুটা সময় প্রয়োজন। রাতারাতি অলৌকিক কিছু ঘটিয়ে ফেলায় বিশ্বাসী নন তিনি, বরং বাস্তবসম্মত লক্ষ্য বা টার্গেট নির্ধারণ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং দক্ষ কর্মী তৈরির মাধ্যমে এগিয়ে চলার পক্ষেই সওয়াল করেছেন স্বপন দাশগুপ্ত। বাংলার এই কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে সামনে রেখে এবার সত্যিই নতুন করে ভাবার সময় এসেছে বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।