প্লাস্টিকের ১০ ও ২০ টাকার নোট আনছে আরবিআই! জল-কাদায় ভিজলেও আর নষ্ট হবে না আপনার টাকা!

দোকানবাজারে কেনাকাটা করতে গিয়ে ছেঁড়া, ময়লা কিংবা সামান্য জলে ভিজে নষ্ট হয়ে যাওয়া ১০ বা ২০ টাকার নোট নিয়ে দোকানদারের সঙ্গে বচসা বা ঝামেলা এ দেশের সাধারণ মানুষের কাছে এক নিত্যদিনের পরিচিত চিত্র। কাগজের তৈরি হওয়ায় সামান্য আর্দ্রতা লাগলেই বা দীর্ঘদিন হাতবদল হওয়ার ফলে এই কম মূল্যের নোটগুলি খুব দ্রুত ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এই দীর্ঘদিনের ভোগান্তি ও আর্থিক টানাপোড়েন দূর করতে এবার এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করল ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI)। জল, কাদা বা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে যা সহজে ছিঁড়বে বা নষ্ট হবে না, সেই বিশেষ প্লাস্টিক বা ‘পলিমার’ প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি আধুনিক মুদ্রা দেশের আর্থিক বাজারে নিয়ে আসার চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক।
বুধবার দেশের সর্বশেষ মুদ্রানীতি পর্যালোচনা করার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই মেগা প্রকল্পের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেন আরবিআই গভর্নর সঞ্জয় মলহোত্রা। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান যে বিশ্বের বহু উন্নত দেশে ইতিমধ্যেই কয়েক দশক ধরে সফলভাবে পলিমার বা প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি কাগজের বিকল্প নোট অত্যন্ত সফলভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সেই আন্তর্জাতিক আধুনিক প্রযুক্তির আদলেই এবার ভারতের মাটিতেও এই মুদ্রা চালুর প্রক্রিয়া জোরকদমে শুরু হয়ে গেছে। এই বিশেষ ধরনের টেকসই নোট তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পলিমার ক্রয়ের উদ্দেশ্যে ইতিমধ্যেই অফিসিয়াল দরপত্র বা টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। সমস্ত প্রযুক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সুরক্ষাজনিত ছাড়পত্র পাওয়ার কাজ যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট পথেই এগোতে থাকে, তবে আগামী অর্থবর্ষের প্রারম্ভেই পরীক্ষামূলকভাবে এই পলিমার নোটগুলি সর্বসাধারণের দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য ভারতীয় বাজারে ছেড়ে দেওয়া হবে।
প্রাথমিক পর্যায়ে কোন কোন মূল্যের নোট বাজারে আসবে, তা নিয়ে বিশদ তথ্য প্রকাশ করে গভর্নর জানিয়েছেন যে যেহেতু দৈনিক কেনাকাটায় ১০ টাকা এবং ২০ টাকার নোট দেশের সর্বস্তরে সবচেয়ে বেশি হাতবদল হয় এবং অন্যান্য নোটের তুলনায় দ্রুত নজিরবিহীনভাবে নষ্ট হয়ে যায়, তাই পরীক্ষামূলক প্রকল্পের শুরুতে এই দুই নির্দিষ্ট মূল্যের নোটই পলিমারে ছাপানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই ১০০ কোটি ১০ টাকার পলিমার নোট এবং সমপরিমাণ অর্থাৎ ১০০ কোটি ২০ টাকার পলিমার নোট ফিল্ড ট্রায়ালের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে মঞ্জুর করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের অবগতির জন্য জানিয়ে রাখা ভালো যে, নতুন এই প্লাস্টিক বা পলিমার নোট বাজারে এলেও প্রচলিত পুরনো ১০ ও ২০ টাকার কাগজের নোটগুলি কিন্তু এক ঝটকায় বাতিলের খাতায় চলে যাচ্ছে না। বরং নতুন এবং পুরনো—উভয় ধরনের নোটই দেশের বাজারে সমান্তরালভাবে সম্পূর্ণ বৈধ হিসেবে লেনদেন করা যাবে।
হঠাৎ কেন এই প্লাস্টিক প্রযুক্তির শরণাপন্ন হলো রিজার্ভ ব্যাঙ্ক? আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আরবিআই প্রধান মূলত দুটি বড় সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্যেই এই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রথমত, এই আধুনিক নোটগুলি তৈরিতে এক বিশেষ নমনীয় ও শক্তিশালী প্লাস্টিক ফিল্ম ব্যবহার করা হয়, যার ফলে এগুলি সাধারণ কাগজের নোটের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং চাইলেও সহজে ছেঁড়া যায় না। দ্বিতীয়ত, প্রচলিত কাগজের নোট ঘন ঘন ছিঁড়ে বা নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে বারবার বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে নতুন নোট পুনর্মুদ্রণ করতে হয়। পলিমার নোটগুলি দীর্ঘদিন ধরে অক্ষত অবস্থায় টিকে থাকায় দীর্ঘমেয়াদে দেশের নোট ছাপানোর সার্বিক খরচ অনেকটাই হ্রাস পাবে। এই প্রাথমিক পরীক্ষামূলক ফিল্ড ট্রায়াল যদি পুরোপুরি সফল হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে অন্যান্য বড় মূল্যের নোটেও এই আধুনিক প্লাস্টিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হতে পারে।