পেট্রোলে ২০% ইথানল মেশানোতেই কি শেষ? জ্বালানির দাবিতে মোদি সরকারের বড় চাল!

গাড়িতে ব্যবহারের জন্য পেট্রোলে ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত ই২০ জ্বালানি চালু হয়েছে আগেই। সম্প্রতি পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী আরও বেশি ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল চালুর সওয়াল করেছেন। এমনকি, সরকার পেট্রোলে ৮৫ শতাংশ ইথানল জ্বালানি ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়ে খসড়া বিজ্ঞপ্তিও জারি করেছে। ইথানল মেশানো পেট্রোলে গাড়ির ক্ষতি হওয়ার কিংবা মাইলেজ নিয়ে এখন অনেক প্রশ্নও উঠেছে। তবে ইথানল মিশ্রণ ভারতের জ্বালানি স্বনির্ভরতার পথে যে বড় পদক্ষেপ, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আসুন এসম্পর্কে বিস্তারিত বুঝে নেওয়া যাক।

২০২৫–২৬ অর্থবছরে ভারতের অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল আমদানির নির্ভরতা ৮৮ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এক দশক আগে এই হার ছিল প্রায় ৮৩ শতাংশ। দীর্ঘদিন ধরে এই নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও আমদানিনির্ভরতা বেড়েই চলেছে। গত এক দশকে দেশের নিজস্ব ক্রুড অয়েল উৎপাদন কমেছে, অথচ জ্বালানির চাহিদা ক্রমাগত বেড়েছে। প্রতি বছর পেট্রোলিয়াম আমদানিতে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয় হয়, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার উপর বড় চাপ সৃষ্টি করে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে বা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হলে এই সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করে।

এই নির্ভরতা কমানোর একমাত্র দীর্ঘমেয়াদি উপায় হল আমদানি করা জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে আনা। অপরিশোধিত তেলের মতো ইথানল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় না। ভারতে মূলত আখ, গুড় এবং উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য থেকে ইথানল উৎপাদিত হয়, যা দেশের নিজস্ব কৃষি অর্থনীতির উপর নির্ভরশীল। পেট্রোলে যত লিটার ইথানল মেশানো হয়, তত লিটার অপরিশোধিত তেল কম আমদানি করতে হয়। ফলে ইথানলের পেছনে ব্যয় করা প্রতিটি টাকা দেশের অর্থনীতির মধ্যেই থাকে। ২০১৩–১৪ সালে ইথানলের মিশ্রণের হার ১.৫৩ শতাংশ থাকলেও, ২০২৫–২৬ অর্থবছরেই ২০ শতাংশ অর্থাৎ ই২০ (E20) মিশ্রণের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, এই কর্মসূচির ফলে ১.৪ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়েছে এবং ১.২ লক্ষ কোটি টাকার বেশি অর্থ সরাসরি কৃষকদের হাতে পৌঁছেছে। এর পাশাপাশি প্রায় ৭০০ থেকে ৭৩৬ লক্ষ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমেছে।

সামাজিক মাধ্যমে ই২০ নিয়ে সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগ শোনা যায়, তা হল এটি নাকি গাড়ির মাইলেজ কমিয়ে দেয় এবং ইঞ্জিনের ক্ষতি করে। তবে এই দাবির পেছনে প্রকৃত বৈজ্ঞানিক তথ্যের নজরদারি থাকা জরুরি। সরকার কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই এটি চালু করেনি। নীতি আয়োগ, এআরএআই (ARAI), এসআইএএম (SIAM) এবং বিভিন্ন গাড়ি নির্মাতা সংস্থার যৌথ উদ্যোগে দীর্ঘ গবেষণা করা হয়েছে। সরকার এবং শিল্প সংস্থাগুলি স্বীকার করেছে যে, কিছু পুরনো গাড়িতে সামান্য ২ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি দক্ষতা কমতে পারে। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে অতিরিক্ত মাইলেজ হ্রাসের দাবি করা হয়, তার কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই। বরং ই২০-র অকটেন সংখ্যা সাধারণ পেট্রোলের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় এটি গাড়ির ত্বরণ ও চালানোর অভিজ্ঞতা উন্নত করতে পারে।

ভারত আমদানির উপর নির্ভর করেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। দেশের কাছে এমন একটি দেশীয় বিকল্প রয়েছে, যা কৃষকদের আয় বাড়ায়, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করে এবং দূষণ কমায়। সুসংহত তথ্যের ভিত্তিতে চালু হওয়া এই কর্মসূচি দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।