পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুরে এক মহিলাকে গাছে বেঁধে, বিবস্ত্র করে নৃশংসভাবে মারধরের অভিযোগ ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। স্থানীয় একটি রাস্তা তৈরির কাজে দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় ওই মহিলাকে এই ভয়াবহ পরিণতির শিকার হতে হয়েছে বলে জানা গেছে। এই পৈশাচিক ঘটনার খবর প্রকাশ্যে আসতেই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা রুজু করেছে জাতীয় মহিলা কমিশন (NCW)। কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে, এই ঘটনা শুধু অপরাধ নয়, বরং একজন মহিলার মৌলিক অধিকার ও আত্মমর্যাদার ওপর চরম আঘাত।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও নৃশংসতা স্থানীয় সূত্রের খবর, ওই এলাকায় একটি সরকারি রাস্তা তৈরির কাজে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ওই মহিলা সাহসের সঙ্গে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। অভিযোগ, এর জেরেই স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাঁদের অনুগামীরা ওই মহিলার ওপর চড়াও হয়। তাঁকে প্রকাশ্য রাস্তায় একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে ফেলা হয়। এরপর তাঁকে বিবস্ত্র করে বেধড়ক মারধর করা হয়। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, যখন এই অমানবিক অত্যাচার চলছিল, তখন ওই মহিলার নাবালিকা মেয়েও সেখানে উপস্থিত ছিল। মায়ের ওপর এই ভয়াবহ নির্যাতন দেখে সে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে।
জাতীয় মহিলা কমিশনের কড়া পদক্ষেপ গত ২৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় মহিলা কমিশন একটি সরকারি বিবৃতির মাধ্যমে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। কমিশনের মতে, এই ধরণের লিঙ্গ-ভিত্তিক হিংসা ভারতীয় সংবিধানের ১৪, ১৫, ২১ এবং ২৩ নম্বর ধারার সরাসরি পরিপন্থী। কমিশন পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ডিজিপি-কে অবিলম্বে এই ঘটনায় এফআইআর (FIR) দায়ের করার নির্দেশ দিয়েছে। একইসঙ্গে, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে এবং সমস্ত ফরেনসিক ও ইলেকট্রনিক তথ্য-প্রমাণ (সিসিটিভি ফুটেজ বা ভিডিও) দ্রুত সংরক্ষণ করার কথা বলা হয়েছে।
কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই মামলার বিচার যেন ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্টে হয় এবং দ্রুত চার্জশিট জমা দেওয়া হয়। আগামী ৫ দিনের মধ্যে রাজ্য প্রশাসনকে একটি বিস্তারিত ‘অ্যাকশন টেকেন রিপোর্ট’ (ATR) জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে দিল্লি।
অন্যান্য রাজ্যে কমিশনের সক্রিয়তা মহিলাদের সুরক্ষায় জাতীয় মহিলা কমিশন যে কতটা তৎপর, তার প্রমাণ মিলেছে তেলঙ্গানার একটি সাম্প্রতিক ঘটনাতেও। সেখানে মুলুগু জেলার মেদারাম গ্রামে এক নাবালিকাকে গণধর্ষণের গুজব ছড়িয়েছিল। কমিশনের সদস্য ডেলিনা খংদুপ ব্যক্তিগতভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তদন্তের পর তিনি জানান যে, গণধর্ষণের খবরটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ছিল এবং জনৈক ইউটিউবার এই বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছিলেন। কমিশন সেই সময় সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের সতর্ক করে জানিয়েছিল যে, সংবেদনশীল খবর পরিবেশনের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল হওয়া একান্ত প্রয়োজন।
পূর্ব মেদিনীপুরের এই ঘটনা রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুনরায় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। দুর্নীতির প্রতিবাদ করলে একজন মহিলাকে কেন এমন লাঞ্ছনার শিকার হতে হবে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে ক্ষোভ বাড়ছে। এখন দেখার, জাতীয় মহিলা কমিশনের হস্তক্ষেপের পর পুলিশ প্রশাসন অপরাধীদের বিরুদ্ধে কতটা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে।