পুজোর মুখে জঙ্গলমহলে টাকার বৃষ্টি! জলের দরে বিক্রি হওয়া যে ঘাস রাতারাতি চাষিদের বানিয়ে দিল লাখপতি

উৎসবের মরশুমের ঠিক প্রাক্কালে জঙ্গলমহলের রুক্ষ ও পাথুরে লালমাটি যেন সত্যি সত্যিই কৃষকদের কাছে সোনার খনিতে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা আর হাড়ভাঙা পরিশ্রমকে পেছনে ফেলে এবার জঙ্গলমহলের চাষিদের ভাগ্য বদলাতে শুরু করেছে এক বিশেষ প্রাকৃতিক উপাদানের হাত ধরে। শারদোৎসবের আনন্দ দ্বিগুণ করে দিয়ে পুজোর ঠিক মুখেই ভিনরাজ্যে হু-হু করে বেড়ে চলেছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী বাবুই ঘাসের চাহিদা। ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ডের পাইকারদের লম্বা লাইন এখন বেলপাহাড়ির প্রতিটি গ্রামে গ্রামে দেখা যাচ্ছে। একসময় যে ঘাস জলের দরে বিক্রি করতে বাধ্য হতেন প্রান্তিক কৃষকরা, আজ সেই বাবুই ঘাসই তাঁদের এনে দিচ্ছে অভাবনীয় ও রেকর্ড মুনাফা। চাষিদের চোখে-মুখে এখন বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস ও স্বস্তির চওড়া হাসি।

অন্যান্য বছর ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে বাবুই ঘাসের বাজারদর সাধারণত ঘোরাফেরা করত মেরেকেটে ১০ থেকে ১২ টাকার মধ্যে। সারাবছরের উৎপাদন খরচ ও শারীরিক পরিশ্রমের পর চাষিদের হাতে কার্যত কিছুই থাকত না বললেই চলে। কিন্তু চলতি মরশুমে ছবিটা পুরোপুরি বদলে গিয়েছে। একধাক্কায় দাম লাফিয়ে পৌঁছে গেছে ৩০ থেকে ৪০ টাকায়। অর্থাৎ সরাসরি তিন থেকে চার গুণ বেশি মুনাফা ঘরে তুলছেন কৃষকরা। অভাবনীয় এই নায্য দাম হাতে পেয়ে তাজ্জব হয়ে গেছেন জঙ্গলমহলের সাধারণ মানুষ।

বেলপাহাড়ির প্রত্যন্ত আমলাশোল, কাঁকড়াঝোড়, ভুলাভেদা কিংবা বাঁশপাহাড়ির মতো জঙ্গলঘেরা জনপদগুলিতে এখন দিনরাত এক করে চলছে ঘাস কাটার তোড়জোড়। চাষিরা জানাচ্ছেন, ভাদ্র ও আশ্বিনের এই নির্দিষ্ট সময়টিই বাবুই ঘাস কাটার মোক্ষম ও উপযুক্ত সময়। এই নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেলে ঘাস শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যায় এবং তখন তা দিয়ে আর ভালো সুতো বা দড়ি তৈরি করা সম্ভব হয় না। ফলস্বরূপ, বেলপাহাড়ির রুক্ষ মাটির ডাহিতে এখন কাস্তে হাতে পুরুষ ও মহিলা—উভয়েরই দম ফেলার বিন্দুমাত্র ফুরসৎ নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুজোর মরশুমে প্রতিমা নির্মাণ থেকে শুরু করে হরেক রকমের থিম মণ্ডপের আকর্ষণীয় সাজসজ্জা, রকমারি হস্তশিল্প এবং অত্যন্ত মজবুত ও টেকসই দড়ি তৈরির জন্য বাবুই ঘাসের বিকল্প মেলা ভার। আর এই কারণেই রাজ্য তথা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ডের পাইকাররা সরাসরি এসে হাজির হচ্ছেন বেলপাহাড়ির জঙ্গলে। বাবুই ঘাস কেনার জন্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে রীতিমতো কাড়াকাড়ি পড়ে গিয়েছে। জঙ্গলমহলের রুক্ষ মাটিতে তীব্র রোদ ও ঘামে ভিজে এতদিন যে চাষিরা কেবল দুবেলা দুমুঠো অন্নের জন্য বেঁচে থাকার লড়াই চালাতেন, এই দুর্গাপুজোয় তাঁদের ঘরেই এবার লক্ষ্মীলাভের সুবর্ণ সুযোগ এসেছে। জঙ্গলমহলের সাধারণ মানুষের জীবনে উৎসবের আলো এবার প্রকৃত অর্থেই রঙিন হয়ে উঠেছে।