পাহাড়ের বুকেই গড়ে উঠছে দেশের প্রথম ‘মৌমাছি ভিলেজ’! পুজোর ছুটিতে চমক দিতে প্রস্তুত বাংলার কোন গ্রাম?

পাহাড়, চা-বাগান, নদী কিংবা জঙ্গল—এসবের গতানুগতিক ধারণার বাইরে গিয়ে এবার বাংলার পর্যটন মানচিত্রে যুক্ত হতে চলেছে এক অভিনব ও আকর্ষণীয় অধ্যায়, যার নাম ‘মৌমাছি ভিলেজ’। কালিম্পং জেলার মনোরম পুদুং (Pudung) গ্রামকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে এই বিশেষ উদ্যোগ। মৌমাছি সংরক্ষণ, খাঁটি মধু উৎপাদন, গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন এবং ইকো-ট্যুরিজমকে একই সুতোয় বেঁধে এক নতুন ধরনের টেকসই পর্যটন মডেল গড়ে তোলাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। আসন্ন দুর্গাপুজোর মরশুম থেকেই এই অনন্য প্রকল্প দেশবিদেশের পর্যটকদের কাছে এক নতুন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে বলেই প্রবল আশাবাদী সংশ্লিষ্ট মহল।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন দফতরের ইকো-ট্যুরিজম চেয়ারম্যান ও সিকিম রাজ্য পর্যটনের উপদেষ্টা রাজ বসু জানান, কলকাতার মর্যাদাপূর্ণ ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ফেয়ার (TTF)-এ ইতিমধ্যেই এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছে। ‘সোনার বাংলা থেকে সবুজ বাংলা’—এই সুনির্দিষ্ট স্লোগানকে সামনে রেখেই তৈরি হয়েছে এই মাস্টারপ্ল্যান। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সোনার বাংলা বলতে বোঝানো হয়েছে বাংলার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, প্রাচীন কৃষি, সংস্কৃতি ও মাটির অকৃত্রিম পরিচয়কে, আর সবুজ বাংলা বলতে বোঝানো হয়েছে প্রকৃতি, গভীর বন, নদী, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই উন্নয়নের স্বপ্নকে।

রাজ বসু আরও জানান, বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী কালিম্পংয়ের পুদুং গ্রামের প্রায় ২০০টি বাড়িকে এই প্রকল্পের সরাসরি আওতায় আনার কাজ জোরকদমে শুরু হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সুচারুভাবে মৌমাছি পালন, বিশুদ্ধ মধু সংগ্রহ, পর্যটক আতিথেয়তা এবং গ্রামীণ ব্যবসা পরিচালনার ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। শুধু পুদুং গ্রামেই নয়, ভবিষ্যতে সুন্দরবন থেকে সুউচ্চ সান্দাকফু পর্যন্ত বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের গ্রামে এই একই মডেল সফলভাবে প্রয়োগ করে একটি বৃহৎ ও শক্তিশালী ‘Bee Village Network’ গড়ে তোলার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গ্রামীণ উন্নয়ন দফতরও এই মহতী উদ্যোগে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করে চলেছে।

এই প্রকল্পের পেছনের মূল দর্শনের কথা তুলে ধরে রাজ বসু বলেন, “মৌমাছি অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি প্রাণী হলেও আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাই, তার প্রায় ৬০ শতাংশ উৎপাদনের সঙ্গেই মৌমাছির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। প্রকৃতিতে মৌমাছি না থাকলে ধান, ভুট্টা, হরেক রকমের সবজি বা ফল—কোনো কিছুরই স্বাভাবিক উৎপাদন টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতো না। তাই মৌমাছিকে বাঁচিয়ে রাখা কেবল পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্যই নয়, বরং মানবজাতির খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থেও অত্যন্ত জরুরি। সেই সুদূরপ্রসারী ভাবনা থেকেই পর্যটনের হাত ধরে মৌমাছি সংরক্ষণকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার এই অভিনব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “মৌমাছি ভিলেজে আসার পর পর্যটকরা শুধু মৌমাছি দেখেই ক্ষান্ত হবেন না, তাঁরা বিভিন্ন ধরনের খাঁটি মধু, ঐতিহ্যবাহী মৌপালন পদ্ধতি এবং স্থানীয় পাহাড়ি সংস্কৃতির সঙ্গে অত্যন্ত কাছ থেকে পরিচিত হতে পারবেন। ইতিমধ্যেই লিচু, আম, সর্ষে এবং নিম ফুলসহ হরেক রকমের সুস্বাদু ফুলের মধু সংগ্রহ ও বাণিজ্যিক বিপণনের কাজ পুরোদমে শুরু হয়ে গেছে। চলতি পুজোর মরশুমেই প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ জন উৎসাহী পর্যটক এই অভিনব প্রকল্পে ভিড় জমাবেন বলে আমরা আশা করছি। ইতিমধ্যে প্রায় তিন হাজার মানুষের তরফ থেকে গভীর কৌতূহল ও অনুসন্ধানের সাড়াও মিলেছে। আগামী দিনে এই সফল মডেল সিকিম এবং মেঘালয়ের মতো প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতেও সম্প্রসারণ করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।”

প্রকৃতি সংরক্ষণ, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং এক সম্পূর্ণ নতুন পর্যটন অভিজ্ঞতার সুষম সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ‘মৌমাছি ভিলেজ’ যে বাংলার পর্যটন শিল্পে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করতে চলেছে, সে বিষয়ে একবাক্যে একমত পর্যটন বিশেষজ্ঞরা। যদি এই পরিকল্পনা পুরোপুরি সফল রূপ নেয়, তবে আসন্ন পুজোর ছুটিতে কালিম্পংয়ের পুদুং গ্রাম কেবল সাধারণ পাহাড়প্রেমীদের নয়, বরং প্রকৃতিপ্রেমী এবং টেকসই ইকো-ট্যুরিজমে আগ্রহী ভ্রমণপিপাসুদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠবে।

=