“পরিশ্রম করলে সফলতা আসতে বাধ্য”-এশিয়ান গেমসে সোনা জিতে আবেগঘন পিঙ্কি রায়

“শৈশবের স্বপ্ন আজ পূরণ হলো।” কথাটি বলার সময় গলা ধরে আসছিল নদিয়ার সোনার মেয়ে পিঙ্কি রায়ের। পাশে বসা তাঁর দিদির চোখেও তখন জল। চীনের মাটিতে এশিয়ান গেমসে মহিলাদের কবাডিতে ভারতকে সোনা এনে দিয়ে রানাঘাটে ফিরতেই এক আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী থাকল পুরো শহর। মঙ্গলবার ৬ অক্টোবর রানাঘাট পৌরসভা ভবনে এশিয়াড জয়ী এই তারকা কবাডি খেলোয়াড়কে এক বিশেষ নাগরিক সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।

এশিয়াডে দেশকে শীর্ষ সম্মান এনে দেওয়া পিঙ্কি রায় নিজের শহরে পা রাখতেই তাঁকে সংবর্ধিত করার উদ্যোগ নেন রানাঘাট উত্তর-পশ্চিমের বিধায়ক পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায়। বিধায়ক নিজে শারীরিক অসুস্থতার কারণে উপস্থিত থাকতে না পারলেও তাঁর উদ্যোগে এবং রানাঘাট পৌরসভার কর্মীদের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকেই পিঙ্কির হাতে সম্মানপত্র এবং ২৫,০০০ টাকার উপহার তুলে দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিধায়কের পক্ষ থেকে প্রস্তাব রাখা হয়—রানাঘাটে কবাডি খেলার একটি বিশেষ ট্রেনিং ক্যাম্প গড়ে তোলা হবে, যার নামকরণ করা হবে পিঙ্কির প্রয়াত মায়ের নামে।

মায়ের স্মৃতি ও শৈশবের কঠিন লড়াই

এশিয়াডের মঞ্চে এত বড় সাফল্য পেলেও, যাঁকে কেন্দ্র করে পিঙ্কির এই স্বপ্ন দেখা—সেই মা আজ আর বেঁচে নেই। মঞ্চে দাঁড়িয়ে মায়ের স্মরণে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি এই স্বর্ণজয়ী অ্যাথলিট।

সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পিঙ্কি বলেন, “ছোটবেলার স্বপ্ন আজ সত্যি করতে পেরেছি। কিন্তু আবেগকে সামলানো খুব কঠিন লাগছে। বহু বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে এই কঠোর পরিশ্রমের ফলেই আজ আমরা দেশের জন্য সোনা আনতে পেরেছি। আগামী প্রজন্মের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এই জয় দেখে অনুপ্রেরণা পাবে এবং বুঝবে যে বাধা যাই আসুক, হাল ছাড়া যাবে না। ধৈর্য ধরে লড়াই করলে সাফল্য আসবেই।”

উল্লেখ্য, পিঙ্কির মা পেশায় ছিলেন একজন থিয়েটার কর্মী। মায়ের প্রয়াণের পর থেকে বাবার সংগ্রামের মধ্য দিয়েই পিঙ্কির গড়ে ওঠা। কবাডির পাশাপাশি পিঙ্কি একজন দক্ষ নৃত্যশিল্পীও। বর্তমানে তিনি ভারতীয় রেলের কর্মী হিসেবে খেলায় প্রতিনিধিত্ব করেন। এশিয়াডের এই ঐতিহাসিক স্বর্ণপদক তিনি তাঁর প্রয়াত মা ও বাবাকেই উৎসর্গ করেছেন।

ইরানকে হারিয়ে রোমাঞ্চকর জয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

এশিয়াডের কঠিন সফর সম্পর্কে পিঙ্কি জানান, “এশিয়ান গেমসের আগে আমরা প্রায় ৬ মাসের এক দীর্ঘ এবং কঠিন ট্রেনিং ক্যাম্পে ছিলাম। AKFI, IOA এবং SAI-এর ব্যবস্থাপনায় মানসিকভাবে আমরা স্থিরই করেছিলাম যে সোনা নিয়েই দেশে ফিরব। গ্রুপ পর্বে ইরানকে আমরা ১৪ পয়েন্টে হারিয়েছিলাম। তবে ফাইনালে চাইনিজ তাইপেকে হারিয়ে উঠে আসা ইরান দল আমাদের তীব্র লড়াই দেয়। শেষ পর্যন্ত ৩ পয়েন্টের ব্যবধানে ইরানকে হারিয়ে আমরা ভারতবাসীকে সোনা উপহার দিই।”

নিজের সাফল্যেই থেমে থাকতে চান না এই বঙ্গ তনয়া। রানাঘাটে একটি পূর্ণাঙ্গ কবাডি অ্যাকাডেমি তৈরি করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন তিনি, যাতে এখান থেকেই আগামী দিনের জাতীয় মানের তারকা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি পুরুষদের মতো মেয়েদের জন্যও দ্রুত ‘প্রো কবাডি’ লিগ শুরু করার দাবি জানান তিনি।

উদীয়মান ক্রীড়াবিদদের উদ্দেশে সোনার মেয়ে পিঙ্কি রায়ের সহজ বার্তা—”পড়াশোনা এবং খেলাধুলা, দুটোর মধ্যেই সমতা রেখে এগিয়ে যেতে হবে। লক্ষ্য স্থির রেখে পরিশ্রম করলে সফলতা আসতে বাধ্য।”