‘নির্বাচন কমিশনকে অসম্মান করা হলে আমি আত্মহত্যা করব!’: গণতন্ত্রের রক্ষায় ডঃ মনমোহন সিংয়ের সেই অটল বার্তা

ভারতের গণতন্ত্রের ইতিহাসে সাংবিধানিক মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গিয়েছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিং। প্রাক্তন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (CEC) এস ওয়াই কুরেশির নতুন বই ‘ইন্ডিয়া অ্যান্ড আই: আ হান্ড্রেড মেমোরিজ, নট আ মেমোয়ার’-এ উঠে এসেছে ২০১২ সালের সেই চাঞ্চল্যকর ঘটনার কথা, যা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
ঘটনার সূত্রপাত: ২০১২ সালে উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনের সময় তৎকালীন আইনমন্ত্রী সলমন খুরশিদের একটি মন্তব্যকে ঘিরে চরম বিতর্ক তৈরি হয়। খুরশিদ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে মুসলিমদের কোটা ৪.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯ শতাংশ করা হবে। নির্বাচন কমিশন এই প্রতিশ্রুতিকে আদর্শ আচরণবিধির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করে এবং খুরশিদকে কঠোর তিরস্কার করে। এরপরই কংগ্রেসের অন্দরমহলে কমিশনকে ‘অহংকারী’ ও ‘স্বেচ্ছাচারী’ বলে সমালোচনা শুরু হয়। সরকারের এই আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে কুরেশি সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব হরিশ খারের কাছে তীব্র প্রতিবাদ জানান।
প্রধানমন্ত্রী ও নির্বাচন কমিশনারের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ: হরিশ খারের মাধ্যমেই বিষয়টি পৌঁছায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিংয়ের কাছে। পরের দিনই কুরেশিকে জরুরি ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে তলব করা হয়। নিজের বইতে কুরেশি লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে পৌঁছানোর পর বসার আগেই অত্যন্ত বিষণ্ণ ও উদ্বিগ্ন স্বরে মনমোহন সিং বলেছিলেন— “হরিশ খারে আপনার কথাগুলো আমাকে জানিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হলে আমি আত্মহত্যা করব।”
গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার: এস ওয়াই কুরেশির লেখনীতে উঠে এসেছে, মনমোহন সিং নির্বাচন কমিশনকে কেবল একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেননি, বরং তিনি একে ‘ভারতের গণতন্ত্রের আত্মা’ বলে মনে করতেন। সাংবিধানিক শিষ্টাচার তাঁর কাছে ছিল এক জীবন্ত বিশ্বাস। প্রধানমন্ত্রীর এই আবেগপ্রবণ ও আপসহীন অবস্থান তৎকালীন রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।
প্রাসঙ্গিকতা: প্রাক্তন সিইসি কুরেশির এই নতুন বইটি প্রকাশের পর রাজনৈতিক মহলে এই ঘটনা নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষায় তিনি কতটা সচেতন ও আবেগপ্রবণ ছিলেন, এই ঘটনা তার এক জীবন্ত দলিল। ভারতের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এই অধ্যায়টি যে আজও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।