‘নারীর নির্যাতন বন্ধ কর!’ ৭৯তম বর্ষে হুগলির বিনোগ্রাম দুর্গাপূজার থিম সমাজে আনলো নতুন ভাবনা

হুগলি জেলার তারকেশ্বর ব্লকের অন্তর্গত বিনোগ্রাম উত্তর পাড়ার দুর্গাপুজো এবার পা দিয়েছে গৌরবময় ৭৯তম বর্ষে। দীর্ঘকাল ধরেই এই পুজো শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে নয়, সমাজচেতনা ও প্রতিচ্ছবি হিসেবেও পরিচিত। প্রতি বছরই সমাজের জ্বলন্ত সমস্যাগুলিকে তুলে ধরে মানুষের চিন্তায় নতুন দিশা আনে এই পুজো কমিটি।
এবারের থিম— “নিয়ম করে চেতনা গড়ো, নারীর নির্যাতন বন্ধ কর”—সেই ধারারই এক শক্তিশালী সামাজিক বার্তা।
জন্ম থেকে বার্ধক্য: নারীর সম্পূর্ণ জীবন ফুটিয়ে তুলেছে শিল্প
কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, প্রায় তিন থেকে চার মাস ধরে ৫০ থেকে ৬০ জন কর্মী অক্লান্ত পরিশ্রমে এই থিমের বাস্তব রূপ দিয়েছেন। এবারের থিমের মূল ভাবনায় রয়েছে একজন নারীর জীবনের সম্পূর্ণ যাত্রাপথ— জন্ম থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত। শৈশবের নিষ্পাপতা, কৈশোরের সংগ্রাম, যৌবনের স্বপ্ন ও বাধা, মাতৃত্বের ত্যাগ এবং বার্ধক্যের একাকিত্ব—সবটাই শিল্পকলার মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে প্যান্ডেলের প্রতিটি কোণে।
এই থিমে নারীর জীবনের কূল-প্রতিকূল পরিস্থিতি, তাঁর ইচ্ছা-অনিচ্ছা, সমাজ ও পরিবারের প্রতি তাঁর অবদান এবং একই সঙ্গে তাঁর প্রতি সমাজের অবিচার ও বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বিনোগ্রামের পুজো কমিটি এই বার্তাই দিতে চায় যে, নারী শুধু পরিবারের অংশ নন, তিনি সমাজ গঠনের এক অপরিহার্য শক্তি।
দেবীর আরাধনা নয়, সচেতনতা সৃষ্টিই মূল উদ্দেশ্য
কমিটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, “আমাদের উদ্দেশ্য শুধুই দেবী দুর্গার আরাধনা নয়, বরং সমাজকে মনে করিয়ে দেওয়া যে, নারীকে সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। নারীকে নির্যাতনের শিকার হতে দেখা আজও লজ্জার বিষয়, এবং এটি বন্ধ করার জন্য সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।”
প্যান্ডেল, থিম ও প্রতিমা—সব কিছুতেই প্রতিফলিত হয়েছে নারী শক্তির বার্তা। দর্শকরা এখানে নারীর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়কে এক এক করে ফুটিয়ে তোলা শিল্পসৃষ্টিকে দেখতে পাবেন। এটি কেবল পুজো নয়, এটি যেন এক জীবন্ত প্রদর্শনী, যা দর্শকদের চিন্তায় আলোড়ন তুলবে।
কমিটির সভাপতি বলেন, “দেবী দুর্গা কেবল অসুর সংহারিনী নন, তিনি নারী শক্তির প্রতীক। আমরা চাই মানুষ বুঝুক—নারীকে সম্মান করা মানেই দেবীকে সম্মান করা। সমাজে নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা আমাদের সকলের কর্তব্য।”
বিনোগ্রামের এই দুর্গাপুজো আর কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি সমাজ পরিবর্তনের এক শক্তিশালী মঞ্চ, যা আগামী প্রজন্মকেও সহিংসতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করবে।