এআই ও ফাইভ জি-র যুগেও অন্ধকারের গ্রাসে বক্সা পাহাড়! সপ্তাহের মাত্র ৪ ঘণ্টা হাটের ভরসায় ১৩টি গ্রামের মানুষ

এআই ও ফাইভ জি-র যুগেও মেটেনি মৌলিক চাহিদা! বক্সা পাহাড়ের ১৩টি গ্রামের মানুষের জীবনসংগ্রামের একমাত্র ভরসা সান্তলাবাড়ির হাট
নিজস্ব সংবাদদাতা, আলিপুরদুয়ার: একদিকে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে বিদ্যুৎ গতিতে এগিয়ে চলেছে গোটা বিশ্ব, তখন উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলার বক্সা পাহাড়ের কোলে অবস্থিত ১৩টি গ্রামের হাজারখানেক মানুষকে পেট ভরাতে আজও লড়তে হচ্ছে আদিম প্রতিকূলতার সঙ্গে। সময় ও ব্যবস্থাপনার তীব্র অভাব এবং দুর্গম পাহাড়ি জীবনের জেরে নিত্যদিনের চাল, ডাল, তেল, নুন কেনার জন্য তাঁদের নির্ভর করতে হয় সপ্তাহের মাত্র একটি দিনের নির্দিষ্ট কয়েক ঘণ্টার ওপর।

সান্তলাবাড়ির সাপ্তাহিক হাটের ইতিহাস ও বাস্তবতা
আলিপুরদুয়ার জেলার বক্সা পাহাড়ের পাদদেশে সান্তলাবাড়িতে প্রতি মঙ্গলবার বসে এই ঐতিহাসিক হাট। তাও আবার সপ্তাহের অন্যান্য বাজারের মতো সারাদিন নয়, হাট খোলে মাত্র ৪ থেকে ৫ ঘণ্টার জন্য। সকাল ৭টা থেকে বেলা ১১টা বা বড় জোর ১২টা পর্যন্ত চলা এই হাটের ওপরই চুনাভাটি, তাসিগাও, লেপচাখা, আদমা, সদরবাজার, লালবাংলো, দাঁড়াগাও, সেওগাও, ওচুলুং, খাট্টা লাইন, নামনা, ফুলবাড়ী, গোপ্তা-সহ মোট ১৩টি গ্রামের বাসিন্দারা নির্ভরশীল।

ভোরের আলো ফোটার আগেই পাহাড়ি দুর্গম পথ পায়ে হেঁটে সমতলে নেমে বাসে বা অন্যান্য উপায়ে এই হাটে পৌঁছন গ্রামবাসীরা। যত তাড়াতাড়ি তাঁরা হাটে পৌঁছাতে পারেন, তত দ্রুত সারা সপ্তাহের বাজার সেরে বাড়ি ফিরতে পারবেন। বক্সা জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত গাড়ি চললেও বাকি পাহাড়ি এবড়োখেব্রো পথটুকু বাজার নিয়ে পুরোপুরি পায়ে হেঁটেই গ্রামে ফিরতে হয় তাঁদের।

পুরোনো দিনে পণ্যের বিনিময়ে পণ্য প্রথার স্মৃতি
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, একসময় এই বাজারে নগদ টাকার বদলে পণ্যের বিনিময়ে পণ্য কেনাবেচার (Barter System) চল ছিল। বক্সার পাহাড়ের ঢলে উৎপাদিত কমলালেবু, আদা, কাগজি লেবু, কোয়াস ও পঞ্চমুখী কচুর বিনিময়ে ব্যবসায়ীদের থেকে চাল, ডাল, তেল, নুন নিতেন পাহাড়ি মানুষেরা। তবে ১৯৯৩ সালের ভয়াবহ বন্যার পর সেই প্রথা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। আজ সেই ঐতিহ্যবাহী হাট কেবল বেঁচে রয়েছে পাহাড়ি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এক বেঁচে থাকার লড়াই হিসেবে।

এবিষয়ে কালচিনি ব্লকের বিডিও বিশ্বরূপ বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান যে, বিষয়টি তাঁর সেভাবে জানা ছিল না, তবে তিনি পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। আধুনিকতার নানা ছোঁয়া শহর ও সমতলে এসে পৌঁছলেও বক্সা পাহাড়ের এই জনপদের মানুষের জীবন যে আজও কতটা কঠিন ও संघर्षময়, সান্তলাবাড়ির এই সকালের হাট তারই এক জলজ্যান্ত দলিল।