নদীর জল নয়, মানুষের গাফিলতিই পাঞ্জাব বন্যার কারণ, সরকারি গাফিলতিতে ১৩,৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি

চলতি বছরের আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে প্রবল বর্ষণ এবং নদীর জল উপচে পাঞ্জাবে ১৩,৫০০ কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে। রাজ্যের জলসম্পদ মন্ত্রী বরিন্দর কুমার গোয়েল জানিয়েছেন, এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। বন্যায় এ পর্যন্ত অন্তত ৫৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন, বহু গৃহপালিত পশু মারা গেছে এবং প্রায় ৪.৫ লাখ একর চাষের জমি সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গেছে।
এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে পাঠানকোট জেলার মধ্যপুর ব্যারাজের ফ্লাডগেট ভেঙে পড়া। গত ২৭ আগস্ট টানা বৃষ্টির কারণে ব্যারাজের দুটি ফ্লাডগেট ভেঙে যায়, যার ফলে জলসম্পদ দপ্তরের একজন কর্মী নদীর তীব্র স্রোতে ভেসে গিয়ে মারা যান। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, লেভেল ৯ বিজ প্রাইভেট লিমিটেড নামের একটি সংস্থা গত বছর ব্যারাজের গেটগুলো ভালো আছে বলে রিপোর্ট দিলেও তা বাস্তবে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এই গাফিলতির জন্য ওই সংস্থার বিরুদ্ধে শোকজ নোটিশ জারি করা হয়েছে এবং দায়ী সরকারি কর্মীদের বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু হয়েছে।
রবির তাণ্ডব ও গাফিলতির অভিযোগ
পাঞ্জাবের তিনটি প্রধান নদী— শতদ্রু, বিয়াস ও রবি—এর মধ্যে রবি নদীই এবারের বন্যার প্রধান কারণ। জলসম্পদ দপ্তরের হিসেব অনুযায়ী, একাই রবি নদী রাজ্যের ৮৫ শতাংশ বন্যার কারণ। পাঠানকোট, গুরুদাসপুর ও অমৃতসর জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রবি নদীর স্বাভাবিক বহনক্ষমতা ৯.৭ লক্ষ কিউসেক হলেও, এবার নদীটিতে ১৪.১১ লক্ষ কিউসেক জল প্রবাহিত হয়েছে, যা ১৯৮৮ সালের বন্যার রেকর্ডকেও ছাপিয়ে গেছে।
রাজ্য সরকার ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের (IMD) বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ এনেছে। তাদের দাবি, বাঁধ থেকে জল ছাড়ার সঠিক সিদ্ধান্ত সময়মতো নেওয়া যায়নি, কারণ আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস সঠিক ছিল না। ২৪ থেকে ২৭ আগস্টের মধ্যে রণজিৎ সাগর বাঁধ এলাকায় পূর্বাভাসের তুলনায় ছয় থেকে সাত গুণ বেশি বৃষ্টি হয়েছিল।
কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাব
রাজ্যের জলসম্পদ মন্ত্রী বরিন্দর কুমার গোয়েল কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা ২০,০০০ কোটি টাকার বিশেষ ত্রাণ চেয়েছিলাম, কিন্তু কেন্দ্র মাত্র ১,৬০০ কোটি টাকার সাহায্য ঘোষণা করেছে, যা আমাদের বিপুল ক্ষতির তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।” তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের মন্তব্যেরও তীব্র সমালোচনা করেন, যিনি বন্যার জন্য অবৈধ বালি খননকে দায়ী করেছিলেন। মন্ত্রী বলেন যে, রবি নদীর সীমান্তবর্তী এলাকায় এমন খনন হয় না এবং তার মন্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
প্রাক্তন প্রধান ইঞ্জিনিয়ার অমরজিৎ সিং দুল্লেত জানান, “প্রায় ৭০ শতাংশ বন্যাই মানুষের গাফিলতির কারণে হয়েছে। মধ্যপুর হেডওয়ার্কসের গেট ভেঙে পড়া রক্ষণাবেক্ষণের চরম গাফিলতিকেই তুলে ধরে।” তিনি দোষী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পাঞ্জাবে বন্যার তীব্রতা ও ধরন পরিবর্তন হচ্ছে, তাই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছাড়া ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ বিপর্যয় হতে পারে।