‘দেশে কি দু’রকম আইন?’ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অশালীন মন্তব্যে এফআইআর হতেই চরম ক্ষোভ সিজেপি-র

দিল্লির যন্তর মন্তরে নিট (NEET) আন্দোলন চলাকালীন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্দেশ্যে অত্যন্ত অশালীন ও কুরুচিকর ভাষা ব্যবহারের অভিযোগে এক কিশোরীর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেছে পুলিশ। তবে পুলিশ প্রশাসনের এই কঠোর ও দ্রুত পদক্ষেপের বিরুদ্ধে এবার অত্যন্ত জোরালো ভাষায় সুর চড়াতে দেখা গেছে ককরোচ জনতা পার্টিকে (CJP)। আন্দোলনকারী এই রাজনৈতিক সংগঠনটির মতে, ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে গালিগালাজ বা খারাপ ভাষা ব্যবহার করা নিঃসন্দেহে একটি নিন্দনীয় বিষয়, কিন্তু তার জন্য রাষ্ট্রের কঠোর ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা এবং পুলিশকে লেলিয়ে দেওয়াকে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এটিকে সম্পূর্ণ ‘অন্যায্য ও বেআইনি’ বলে অভিহিত করে ক্ষোভ উগরে দিয়েছে সিজেপি নেতৃত্ব।
সিজেপি-র মুখ্য মুখপাত্র সৌরভ দাস কড়া ভাষায় প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘‘এই দেশে রাজনৈতিক ক্ষোভ দেখাতে গিয়ে গালিগালাজ করা বা অশালীন শব্দ ব্যবহার করা কবে থেকে সরাসরি ফৌজদারি অপরাধের আওতাভুক্ত হয়ে গেল? অথচ দেশের লোকসভার প্রায় ৫০ শতাংশ সাংসদের বিরুদ্ধেই তো খুন, অপহরণ ও ধর্ষণের মতো গুরুতর সব ফৌজদারি মামলা ঝুলছে, তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশ বা প্রশাসন ঠিক কী ধরনের আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে?’’ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘এক্স’-এ সৌরভ দাস আরও লেখেন যে, কটূ ভাষা বা কড়া মন্তব্য কখনওই ফৌজদারি অপরাধ হতে পারে না। একেকজনের কাছে ভাষা ও রুচির মাপকাঠি একেক রকম হতে পারে। যে সমস্ত বক্তব্য সরাসরি কোনো ধরনের হিংসা বা হানাহানি উস্কে দেয় না, তা স্রেফ একটি রাজনৈতিক বক্তব্য মাত্র। এ ধরনের বক্তব্যের মোকাবিলা করা উচিত আরও জোরালো এবং পাল্টা রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমেই, পুলিশ বা রাষ্ট্রশক্তিকে ব্যবহার করে নয়। বর্তমান যুবসমাজকে এভাবে আইনি জালে ফাঁসিয়ে হেনস্থা করা অবিলম্বে বন্ধ করা হোক এবং ওই কিশোরীকে নিঃশর্তে সমস্ত আইনি ঝামেলা থেকে রেহাই দেওয়া হোক বলে জোর দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
অন্যদিকে, সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে এই গোটা এফআইআর প্রক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করে দেশের বিচারব্যবস্থায় ‘দ্বিমুখী নীতি’ বা দ্বিচারিতা চলার অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। একটি বিশেষ ভিডিও বার্তায় তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন যে, শাসক দল বিজেপি নেতৃত্ব কিংবা তাদের নিজস্ব আইটি সেলের সদস্যরা যখন দিনের পর দিন সোশ্যাল মিডিয়ার ভার্চুয়াল দুনিয়ায় সাধারণ মানুষ ও মহিলাদের সবচেয়ে কুরুচিকর ভাষায় আক্রমণ করেন, তখন পুলিশ কেন কোনো স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ নেয় না? দিপকে কটাক্ষের সুরে বলেন, ‘‘গালিগালাজ করার অপরাধে যদি সত্যিই এফআইআর দায়ের করতেই হয়, তবে বিজেপির সেই সমস্ত আইটি সেলের সদস্যদের বিরুদ্ধে কবে কড়া মামলা রুজু হবে, যারা বছরের পর বছর ধরে অনলাইনে সাধারণ মানুষকে নিশানা করে নোংরা ভাষা ব্যবহার করে আসছে? তারা গর্বের সঙ্গে তাদের সোশ্যাল মিডিয়া বায়োতে লেখে ‘ফলোড বাই পিএম মোদী’। তারা নারীদের ও বিরোধীদের গালিগালাজ করলে কোনো শাস্তি নেই, আর প্রতিবাদের উত্তাপে কিছু আপত্তিকর শব্দ বেরোলেই তৎক্ষণাৎ এফআইআর?’’
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৩ জুলাই, যখন যন্তর মন্তরে নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে আয়োজিত এক বিশাল আন্দোলন চলাকালীন প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠে গাজিয়াবাদের বাসিন্দা স্মৃতি সিংয়ের বিরুদ্ধে। এই ঘটনার জেরে নয়ডার এক্সপ্রেসওয়ে থানায় একটি ‘জিরো এফআইআর’ (Zero FIR) দায়ের করা হয়। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর ৩৫২, ৩৫৩(১) এবং ৩৫৬(১) ধারায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে নয়ডা পুলিশ স্পষ্ট করে জানায় যে, যেহেতু মূল ঘটনাটি দিল্লির সীমানার মধ্যে ঘটেছে, তাই যথাযথ তদন্তের জন্য মামলাটি নতুন দিল্লি পুলিশের কাছে স্থানান্তরিত করা হচ্ছে।
এদিকে, দেশজুড়ে যখন এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তাপ চরম আকার ধারণ করেছে, ঠিক তখনই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক মানবিক বার্তা দিয়ে সমস্ত বিতর্ক প্রশমিত করার চেষ্টা করেছেন। শুক্রবার একটি বিশেষ সামাজিক মাধ্যম ভিডিও বার্তার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী জানান যে, আন্দোলনের উত্তেজনায় তাঁকে ও তাঁর প্রয়াত মাকে উদ্দেশ্য করে যাঁরা অত্যন্ত কুরুচিকর ভাষায় আক্রমণ ও গালিগালাজ করেছেন, দেশের সেই তরুণ শিক্ষার্থীদের তিনি মন থেকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের দেশের ‘পথভ্রষ্ট সন্তান’ হিসেবে অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘যে ধরনের কুরুচিকর শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, তা কোনো সুস্থ ও সভ্য সমাজে কখনোই মানায় না। কিন্তু আমাদের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত তরুণ সমাজকে শাস্তির মুখে ঠেলে না দিয়ে বা আইনি জালে না জড়িয়ে তাঁদের সঠিক পথ দেখানো এবং ভালোবাস দিয়ে শুধরে নেওয়া।’’