দেবরাজ জিউসের সিংহাসনে কি বসবে ইউনেস্কোর সিলমোহর? অলিম্পাস পর্বতের ভাগ্য ঝুলে দক্ষিণ কোরিয়ায়!

গ্রিসের কিংবদন্তি মাউন্ট অলিম্পাস কেবল একটি সুউচ্চ পর্বত নয়, এটি হাজার হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং প্রাচীন বিশ্বাসের এক অনন্য জীবন্ত দলিল। প্রাচীন গ্রিক পুরাণ অনুসারে, এই পবিত্র পর্বতটি ছিল দেবরাজ জিউস এবং বারোজন অলিম্পিয়ান দেবতার মূল আবাসস্থল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৯১৮ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই পর্বতের তুষারাবৃত চূড়া এবং মেঘে ঢাকা শিখর যুগের পর যুগ ধরে মানব সভ্যতার কল্পনাকে প্রভাবিত করে আসছে। বর্তমানে এই ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য স্বীকৃতি দিতে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় মাউন্ট অলিম্পাসকে অন্তর্ভুক্ত করার সুদূরপ্রসারী প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির বৈঠকে এই মর্যাদাপূর্ণ মনোনয়ন নিয়ে বর্তমানে বিস্তারিত আলোচনা চলছে।
পৌরাণিক কাহিনীর গণ্ডি পেরিয়ে মাউন্ট অলিম্পাস গ্রিসের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। লিটোকোরো শহরের মতো পর্বতের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষের পর্যটন, অর্থনীতি এবং সামাজিক পরিচয় এই পাহাড়ের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ডিওন-অলিম্পাসের মেয়র ইভাগেলোস জেরোলিওলিওসের মতে, স্থানীয়দের কাছে এই পর্বত নিছক কোনো পর্যটন কেন্দ্র নয়, বরং জীবনের একটি বিশেষ অঙ্গ। প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজে এই পর্বতের ঢালে প্রাচীন হেলেনিস্টিক যুগের উন্মুক্ত ধর্মীয় স্থানের সন্ধান মিলেছে, যা প্রমাণ করে যে প্রাচীনকালে মানুষ জিউসের উদ্দেশ্যে বলিদান দিতে এবং আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে এই দুর্গম পাহাড়ে চড়ত। সময়ের পরিক্রমায় গ্রিসে খ্রিস্টধর্মের প্রভাব বিস্তারের পরেও এই পবিত্র পর্বতটির আধ্যাত্মিক গুরুত্ব বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি।
পর্বতের প্রায় ২,৮০৩ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত প্রফেট ইলিয়াস পিকের বিখ্যাত অর্থোডক্স চ্যাপেলটি বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ খ্রিস্টান অর্থোডক্স তীর্থক্ষেত্র হিসেবে সমাদৃত। এর পাশাপাশি, এনিপিয়াস গিরিখাতে অবস্থিত ১৫৪২ সালের প্রাচীন মঠ এবং সেন্ট ডায়োনিসিয়াসের পবিত্র গুহা প্রাচীন গ্রিক পুরাণ, বাইজেন্টাইন ঐতিহ্য এবং খ্রিস্টান সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিলনক্ষেত্র গড়ে তুলেছে। ২০১৪ সালে গ্রিস এই পর্বতটিকে ইউনেস্কোর অস্থায়ী তালিকায় যুক্ত করে। তবে উপদেষ্টা সংস্থা আইকোমোস (ICOMOS) এবং আইইউসিএন (IUCN)-এর বিশদ পর্যালোচনার পর ২১টি দেশের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটি অতিরিক্ত তথ্যের জন্য মনোনয়ন প্রক্রিয়াটি আপাতত দীর্ঘায়িত করতে পারে।
ইউনেস্কোর মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি পাওয়ার প্রক্রিয়াটি যেমন গৌরবের, তেমনই এটি স্থানীয় প্রশাসনের জন্য এক বিরাট বড় চ্যালেঞ্জও বটে। স্বীকৃতির পর বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলে এই অতি সংবেদনশীল ও ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতিমধ্যেই কিছু পর্যটকের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট এলাকায় ক্যাম্পিংয়ের নিয়ম লঙ্ঘন করা, যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। আলপাইন ক্লাবের সভাপতি বাবিস মারিনিদিসের মতে, অতিরিক্ত ভিড় ও পর্যটকদের চাপ থেকে অলিম্পাসকে রক্ষা করতে অবিলম্বে কঠোর দর্শনার্থী নিবন্ধন এবং প্রবেশমূল্য চালুর মতো জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন।