আর মাত্র কয়েক দিন পর ২০ অক্টোবর সারা দেশে পালিত হবে আলোর উৎসব দীপাবলি। কিন্তু আনন্দের এই রাতে দিল্লিতে তৈরি হতে চলেছে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। ভারতের আবহাওয়া দপ্তর (IMD) পূর্বাভাস দিয়েছে যে, দীপাবলির রাতে বাতাসের গতিবেগ অত্যন্ত কম (প্রায় ৫ কিমি/ঘণ্টা) থাকবে এবং আকাশ থাকবে মেঘমুক্ত।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, বাতাসের এই স্থবিরতার কারণে বাজি ও ধোঁয়ার সমস্ত দূষণকারী কণা ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি আটকে পড়বে। এর ফলস্বরূপ, রাজধানী দিল্লির বায়ু মান সূচক (AQI) ‘ভয়াবহ’ (Severe) স্তরে পৌঁছে যেতে পারে, যা বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
স্থির বাতাস ও নিম্ন তাপমাত্রা: দূষণ বৃদ্ধির মূল কারণ
বর্তমানে NCR (National Capital Region)-এ বাতাসের গতিবেগ ১০ কিমি/ঘণ্টার নিচে রয়েছে। IMD জানিয়েছে, দীপাবলির রাতে এই গতি আরও কমে যাওয়ার সম্ভাবনা। এই শান্ত আবহাওয়াই দূষণ ছড়িয়ে যেতে বাধা দেবে।
তাপমাত্রার প্রভাব: এই সময়ে দিল্লির সর্বনিম্ন তাপমাত্রা প্রায় ১৮.২°C-এর কাছাকাছি, যা শীতের আগমনী বার্তা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় বায়ুমণ্ডলীয় মিশ্রণের উচ্চতা কমে যায়। এর ফলে ধোঁয়া ও অন্যান্য সূক্ষ্ম কণা মাটির কাছাকাছি আটকে পড়ে।
GRAP-এর প্রথম ধাপ চালু: বাতাসে PM2.5-এর মাত্রা ‘খারাপ’ (Poor) স্তরে (২০০-এর উপরে) প্রবেশ করায় ইতিমধ্যেই কমিশন ফর এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট (CAQM) গ্রেডেড রেসপন্স অ্যাকশন প্ল্যান (GRAP)-এর প্রথম ধাপ কার্যকর করেছে। নয়ডার AQI বর্তমানে ৩১৮-এরও বেশি, যা ‘খুব খারাপ’ (Very Poor) বা ‘ভয়াবহ’ স্তরের দিকে এগোচ্ছে।
কুয়াশা ও দূষণের ‘পারফেক্ট স্টর্ম’
দীপাবলির আগে ও পরে সপ্তাহান্তে দিল্লি ও সংলগ্ন এলাকায় হালকা কুয়াশা (Mist) ও ধোঁয়াশা (Shallow Fog) দেখা যেতে পারে। এই আবহাওয়ার ফলে দূষণের ঘনত্ব আরও বাড়বে এবং শহর ঢেকে যাবে একটি অস্বচ্ছ, ধোঁয়াশার চাদরে। যদিও দিনের বেলায় বাতাসের গতিবেগ কিছুটা (১০-১৫ কিমি/ঘণ্টা) বাড়তে পারে, তবে রাতে আবার তা ৫-৬ কিমি/ঘণ্টায় নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
কম তাপমাত্রা, স্থির বাতাস এবং দূষণ—এই তিনের সংমিশ্রণ উৎসবের পর দূষণকে চরমে নিয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ: GRAP যথেষ্ট নয়
পরিবেশ ও জিওস্পেশিয়াল বিশ্লেষক রাজেশ পাল বলেন, দীপাবলির রাতে দূষণের বেশিরভাগটাই আসে স্থানীয় বাজি এবং যানবাহন থেকে। প্রতিবেশী রাজ্যগুলির ফসলের গোড়া পোড়ানো (Stubble Burning) এবং শিল্পাঞ্চলের ধোঁয়া পরিস্থিতি আরও খারাপ করে।
তাঁর মতে, “GRAP-এর মতো অস্থায়ী পদক্ষেপ কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু বছরব্যাপী নির্গমন নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নত নগর পরিকল্পনা ছাড়া প্রতি শীতেই দিল্লি এই দূষণের জালে আটকে থাকবে।” তিনি এও উল্লেখ করেছেন যে, এই দূষণ কেবল দিল্লিতেই নয়, হরিয়ানা, পাঞ্জাব এবং পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের শহরগুলিতেও মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কর্তৃপক্ষের প্রধান করণীয়:
কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা:
১. বাজি ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ: ঐতিহ্যবাহী বাজি বিক্রি ও পোড়ানো নিষিদ্ধ করার বিধিনিষেধ আরও জোরদার করা। ২. সবুজ বাজি প্রচার: কম দূষণ নির্গমনকারী সবুজ বাজি ব্যবহারের প্রচার বাড়ানো। ৩. জনসচেতনতা: বায়ু দূষণের স্বাস্থ্যগত প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প উপায়ে উৎসব পালনের প্রচার করা। ৪. আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুসরণ: দূষণ বৃদ্ধির ঝুঁকি কমাতে আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দূষণ কিছুটা কমলেও, পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, দীপাবলির বাজির কারণে দূষণের মাত্রা এখনও যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ।