দশ মাস অন্তঃসত্ত্বা থাকার পর চমকে দেওয়ার মতো সত্যি! কাটোয়ার গৃহবধূর ঘটনায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বড় প্রশ্ন

গর্ভধারণের যাবতীয় লক্ষণ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ওষুধ ও ইনজেকশন—সবই ছিল ঠিকঠাক। কিন্তু শেষ মুহূর্তে লেবার রুমে গিয়েই মিলল এক অভাবনীয় ও নিষ্ঠুর সত্যি। চিকিৎসকের পরীক্ষার পর জানা গেল, গৃহবধূ আদৌ অন্তঃসত্ত্বা নন! ঘটনাটি ঘটেছে পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া মহকুমা হাসপাতালে। এই ঘটনায় শোরগোল পড়ে গিয়েছে রাজ্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়।

ঠিক কী ঘটেছিল? কেতুগ্রাম ১ নম্বর ব্লকের হাট মুরগ্রামের বাসিন্দা ওই গৃহবধূ দীর্ঘ ১০ মাস নিজেকে অন্তঃসত্ত্বা বলেই বিশ্বাস করে এসেছিলেন। শুক্রবার প্রসব যন্ত্রণা নিয়ে তাঁকে কাটোয়া হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের পরামর্শে তিনি চিকিৎসাও চালিয়েছেন। এমনকী তাঁকে দেওয়া হয়েছিল ‘মা ও শিশু সুরক্ষা কার্ড’ এবং নিয়মিত ওষুধ ও ইনজেকশনও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু লেবার রুমে পরীক্ষার সময় স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ জানিয়ে দেন, তাঁর গর্ভে কোনো সন্তান নেই। আলট্রাসোনোগ্রাফি রিপোর্টেও সেই তথ্যই উঠে আসে।

চিকিৎসকের ব্যাখ্যা ও ‘সিউডোসাইসিস’: চিকিৎসকদের মতে, ওই গৃহবধূ ‘সিউডোসাইসিস’ (Pseudocyesis) নামক একটি বিরল মানসিক ও শারীরিক অবস্থায় আক্রান্ত। এই রোগে মহিলা গর্ভবতী না হওয়া সত্ত্বেও গর্ভাবস্থার মতো উপসর্গ—যেমন পেটের আকার বৃদ্ধি, বমিভাব, পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি অনুভব করেন। অনেক সময় রোগী নিজেও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে তিনি সন্তানসম্ভবা।

কাঠগড়ায় গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা: এই ঘটনায় স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। পরিবারের অভিযোগ, ১০ মাস ধরে চিকিৎসা চললেও কেন একবারও সঠিকভাবে ইউএসজি (USG) বা নিশ্চিত পরীক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়নি? যদিও হাসপাতালের চিকিৎসক সোমনাথ মুখোপাধ্যায়ের দাবি, তিনি কখনোই ওই গৃহবধূকে গর্ভবতী বলে নিশ্চিত করেননি, বরং শুরু থেকেই পরীক্ষার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কার গাফিলতিতে এই বিভ্রান্তি সৃষ্টি হলো, তা নিয়ে শুরু হয়েছে টানাপোড়েন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ: ঘটনার গুরুত্ব বুঝে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হাসপাতালের সুপার বিপ্লব মণ্ডল জানিয়েছেন, “পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকদের ভূমিকা খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

দীর্ঘ ১০ মাস নিজেকে মা হিসেবে কল্পনা করার পর এই নিষ্ঠুর বাস্তব গৃহবধূ ও তাঁর পরিবারকে এক গভীর মানসিক ট্র্যাজেডির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ঘটনাটি কেবল একটি ব্যক্তিগত বিপর্যয় নয়, বরং গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিষেবার সঠিক নির্ণয় ও সচেতনতার অভাবকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করালো।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy