তৃণমূল ছাত্রনেতা গ্রেপ্তার হতেই পুরুলিয়ায় শোরগোল! কোন মারাত্মক অভিযোগে ফেঁসে গেলেন কিরীটী?

রাজ্যের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে শাসকদলের হেভিওয়েট নেতাদের বিরুদ্ধে একের পর এক কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার যে ধারা অব্যাহত রয়েছে, তারই সর্বশেষ সংযোজন ঘটল মাটির জেলা পুরুলিয়ায়। এবার সরকারি দলের দাপুটে ছত্রছায়ায় থেকে অবৈধভাবে চাঁদা আদায় ও ভয় দেখানোর অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগে সরাসরি পুলিশের জালে ধরা পড়লেন তৃণমূল ছাত্র পরিষদের পুরুলিয়া জেলা সভাপতি কিরীটী আচার্য। খাস পুরুলিয়া জেলাজুড়ে এই চাঞ্চল্যকর গ্রেপ্তারিকে কেন্দ্র করে তীব্র রাজনৈতিক তরজা এবং প্রবল চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী দলগুলির পক্ষ থেকে একে শাসকদলের লাগামহীন দুর্নীতির চরম নিদর্শন বলে কটাক্ষ করা হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গত শনিবার পুরুলিয়ার পাড়া থানায় সশরীরে হাজির হয়ে সঞ্জয় বাউড়ি নামে এক স্থানীয় ব্যক্তি কিরীটী আচার্যের বিরুদ্ধে সরাসরি তোলাবাজি এবং চরম ভয় দেখানোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করেন। সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে এই ধরনের গুরুতর অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নড়েচড়ে বসে জেলা পুলিশ প্রশাসন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্দিষ্ট ধারায় একটি স্বতঃপ্রণোদিত ফৌজদারি মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। এরপরেই সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া মেনে অভিযুক্ত তৃণমূল ছাত্রনেতা কিরীটী আচার্যকে পাকড়াও করেন পাড়া থানার বিচক্ষণ আধিকারিকেরা।
এই প্রসঙ্গে পুরুলিয়া জেলা পুলিশের এক পদস্থ আধিকারিক সংবাদ মাধ্যমকে স্পষ্ট জানিয়েছেন, “একজন সাধারণ নাগরিকের কাছ থেকে প্রাপ্ত সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ আইনসম্মতভাবে কিরীটী আচার্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রবিবার তাঁকে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে রঘুনাথপুর মহকুমা আদালতে তোলা হবে এবং ঘটনার নেপথ্যে থাকা অন্যান্য যোগসূত্রগুলি খুঁজে বের করতে তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার জোরালো আবেদন জানানো হবে।” উল্লেখ্য, এর আগেও পুরুলিয়া জেলায় বিভিন্ন সময়ে সরকারি প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ, দুর্নীতি, প্রতারণা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ভয় দেখানোর মতো একাধিক গুরুতর অপরাধমূলক অভিযোগে প্রথম সারির একাধিক শাসকদলীয় নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সেই তালিকায় রয়েছে পুরুলিয়া জেলা পরিষদের সহকারী সভাধিপতি সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায় এবং জেলা সংখ্যালঘু সেলের জেলা সভাপতি সাদ্দাম হোসেন আনসারির মতো হাই-প্রোফাইল নামগুলিও।
একের পর এক শীর্ষস্থানীয় তৃণমূল নেতার এই ধরনের ধারাবাহিক গ্রেপ্তারি এবং পুলিশের কঠোর অবস্থানের কারণে বর্তমানে পুরুলিয়া জেলাজুড়ে তৃণমূল কংগ্রেসের নিচুতলার কর্মী ও মাঝারি স্তরের নেতাদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতির এতটাই অবনতি হয়েছে যে, অনেক নেতাই এখন প্রকাশ্যে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন এবং দলীয় সমস্ত যোগাযোগ থেকে নিজেদের দূরত্ব বজায় রেখে গৃহবন্দি থাকার পথ বেছে নিয়েছেন।
অন্যদিকে, এই গোটা ঘটনায় শাসকশিবিরকে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে বিজেপির পুরুলিয়া জেলা সভাপতি শঙ্কর মাহাতো অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, “বহু দিন ধরেই সাধারণ মানুষ এই সত্যটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দাবি করে আসছেন যে, তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বস্তরের নেতারা সরাসরি স্বজনপোষণ, দুর্নীতি এবং তোলাবাজির মতো ঘৃণ্য অপরাধমূলক ঘটনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাজ্যে ক্ষমতা বদলের পর থেকে আজ তাঁরা যেমন অন্যায় কাজ করেছিলেন, ঠিক তেমন কর্মের ফলই হাতেনাতে ভোগ করছেন।”
এদিকে, নির্ধারিত প্রক্রিয়া মেনে রবিবার ধৃত অভিযুক্ত তৃণমূল ছাত্রনেতা কিরীটী আচার্যকে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তায় রঘুনাথপুর মহকুমা আদালতে পেশ করা হয়। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, তাঁকে নিজেদের রিমান্ডে নিয়ে জেরা করা হবে যাতে এই তোলাবাজির সিন্ডিকেটের পেছনে অন্য কাদের হাত রয়েছে তা পরিষ্কার হয়ে যায়। তবে আদালতে তোলার সময় মিডিয়ার মুখোমুখি হয়ে ধৃত কিরীটী আচার্য দাবি করেছেন যে, তাঁকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার বানিয়ে বিনা দোষে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। এই ঘটনার জেরে বর্তমানে গোটা পুরুলিয়া জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম উত্তেজনা ও গুঞ্জন শুরু হয়েছে।